প্রকৃতি (Nature)ঃ কি অথবা কে?

 


প্রকৃতি (ইংরেজি : Nature) বলতে এই পৃথিবী তথা সমগ্র সৃষ্টিকে নির্দেশ করে। প্রকৃতি বলতে জাগতিক বিশ্বের মানব সৃষ্ট-নয় এমন দৃশ্য-অদৃশ্য বিষয় এবং জীবন ও প্রাণকে বুঝায়।

অন্য অর্থে প্রকৃতি বলতে বৈশিষ্ট্য ‌কেও বুঝায়। যেমন: মানব প্রকৃতি (মানুষের বৈশিষ্ট্য)। আগেই বলা হয়েছে প্রকৃতি বলতে স্বয়ং স্রষ্টা সৃষ্ট বিশ্বজগত যার মধ্যে মানুষ একটি উপাদান মাত্রগাছ-পালা নদী-নালা পশু-পাখি , পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি সকলবস্তুর‌ মত (উইকিপিডিয়া) ।

প্রকৃতির কাছে মানুষ অতি নগণ্য

প্রকৃতি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, প্রকৃতি কখনো হৃদয় আর ভালোবাসার সঙ্গে ধোঁকা দিতে পারে না।

কিন্তু আমরা যারা নিজেদের মানুষ বলে দাবি করি, সেই আমরা হৃদয় ভাঙি, ভালোবাসার সঙ্গে করি মিথ্যাচার। ভাঙাগড়ার খেলায় জলকাদা মিশিয়ে একাকার করে দিই। প্রকৃতিও তখন বিস্মিত হয়।

ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা খরাএসব তো প্রকৃতিরই লীলা। মানুষ তার অপার ক্ষমতায় সেসব দুর্যোগ জয় করে নিজেকে অতিমানব থেকে কখনো কখনো ঈশ্বর ভেবে বসে। সেই অহংকারের মিথ্যা অভিলাষ মানবজাতিকে আজ বোধহয় টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে এনেছে গভীর এক খাদের কিনারে।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘ন্যাচার অব রিভেঞ্জকিন্তু শুরুতেই বলেছি প্রকৃতি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ বা নেতিবাচক হয় না। তাহলে ন্যাচার অব রিভেঞ্জ কথাটা কেন বলি? তার নিশ্চয় একটা কারণ আছে। প্রকৃতিও মানুষের মতো প্রাণের দাবি রাখে। সহনশীলতা সম্প্রীতি বোধের মাত্রা তারও তো আছে, তাই নয় কি? তাই সময়ের তাগিদে কখনো কখনো প্রতিশোধপরায়ণ তাকেও হতে হয়। কী দেয়নি এই প্রকৃতি আমাদের! আলো-বাতাস-নদী-পাহাড়-ঝরনা-ফুল-প্রজাপতি-মেঘ এমনকি গহিন অরণ্য।

তাই জন মুরের ভাষায় বলি, যখন আমি প্রকৃতির কাছে যাই, মনটাকে হারিয়ে ফেলি, খুঁজে পাই আমার আত্মাকে।

কিন্তু হায়, এই মানবসমাজের অমানবিক আমরা নানা ঘাতপ্রতিঘাতে ধরণির ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে এতটাই বিপর্যস্ত করে তুলেছি যে প্রকৃতির খুব কাছে যেয়েও মন আর আত্মাকে বোঝার মতো মানবিক বোধ আজ মৃতপ্রায় বিকেলে।

অভিমানী প্রকৃতিতে হানা দিয়েছে মরণব্যাধী কোভিড-১৯। কত রকম রোগশোক প্রকৃতি তার বুক পেতে আগলে রাখে এই মানবসভ্যতার জন্য। কিন্তু মনুষ্যত্ব ভূলণ্ঠিত হতে হতে আমরা এমন এক বীভৎস রূপ ধারণ করেছি যে সত্যি প্রকৃতি আজ আমাদের প্রতি বিরূপ। তার কোনো ক্ষমতাই আজ আর আমাদের রক্ষা করতে নারাজ এই মৃত্যুগ্রাসী করোনাভাইরাসের ভয়ংকর থাবা থেকে।

আচ্ছা বলুন তো, কী করে প্রকৃতি উদার হবে? বন, বৃক্ষ, নদী, পাহাড় এমনকি পশুপাখিদের আবাসস্থলেও আজ মানবজাতির রাজত্ব। বয়ে চলা শান্ত নদীর বুক চিরে বানানো হয় মহারাজের পঙ্খীরাজ পাজেরো মার্ডিসিজের জন্য পিচঢালা কংক্রিট পথ। সাগরের সলিল শুভ্র ফেনায় আজ বিষাক্ত দানবের হুংকার। সবুজ কচি পাতার আড়াল ভেঙে গাছেদের বুকে ধারালো করাত বসিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে মানুষ আমরা হয়ে উঠি বণিক বাদশা।

বছরের পর বছর যুগের পর যুগ এভাবেই প্রকৃতি হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত। অশ্রুসিক্ত প্রকৃতি নিজেও আজ মানুষের এমন অসহায়ত্বে স্তব্ধ-নির্বাক।

বৃষ্টিজল যেমন ধুয়ে নেয় জাগতিক পাপতাপ। রৌদ্রের প্রখরতায় শেওলা জমা সব দুঃখবেদনা হয়ে যায় আনন্দরাশি। তেমনি শান্ত নদীর বুকে নরম জলের সঙ্গে মধ্য দুপুরে কাটে যে একাকী সময় তার অনুভূতি ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকেও যেন হার মানায়। তাহলে কেন আমরা প্রকৃতির মতো হই না? কেন হতে পারি না রাতের রুপালি আলোর মতো উদার? সবুজশ্যামল প্রকৃতির সব অবদান কি তবে মিথ্যা?

বহতা নদী হয় ভরাট পাথরের ঢিবি, সবুজ বনানী হয়ে যায় কলকারখানা, সাগর হয় ভাগবাঁটোয়ারা, রাতের আকাশও হয়ে যায় দ্বিখণ্ডিত। মানুষ আর প্রকৃতিতে এখন যোজন যোজন ব্যবধান। মানুষের এই নিষ্ঠুরতায় প্রকৃতি সত্যি নিশ্চুপ। অথচ প্রকৃতিও নিজের মতো করে বাঁচতে চায়।

বন্ধ হয়ে আছে আকাশে বিমান চলাচল। ভিনদেশে আটকে আছেন অনেকেই। ভাবুন তো, টাকাই কি তবে সব? মুঠোভর্তি টাকা মাথায় কত বিদ্যে কিন্তু প্রকৃতির অঘোষিত হঠাৎ আসা এক মরণথাবা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা। তাহলে কোথায় মানুষের ক্ষমতা? মানুষ প্রকৃতির কাছে সত্যিই অতিক্ষুদ্র।

ভেবে দেখুন, আমরা মানুষেরা কত অসহায়! অথচ প্রকৃতি কিন্তু থেমে নেই। এখনো সূর্য উঠছে, রোজ সকালে পাখিও ডাকছে। ফুলেরাও হেসেখেলে দিব্যি রয়েছে। থেমে গেছি কেবল আমরা যাদের সৃষ্টিকর্তা আশরাফুল মাখলুকাত বলেছেন। আমরা কি সেই মর্যাদাটুকু রাখতে পারছি? তবে কিসের এত দাম্ভিকতা?

মানুষের সামনে আজ সব দুয়ার বন্ধ। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে কঠিন এক পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন। বোঝাতে চেয়েছেন, কোনো ক্ষমতাই তোমাদের নেই। এমনকি প্রকৃতিও মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে মাত্র। বেঁচে থাকাটাই মানুষের জন্য আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অহংকার, লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষএসব তোমাদের মানায় না, তোমাদের সামর্থ্য খুব সীমিত।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, প্রকৃতির কাছে গেলে মন ভালো হয়ে যায়, প্রকৃতি সুন্দর হলে মনও সুন্দর হয়ে যায়। কিন্তু কোথায় গেলে আর কতটা বোঝালে মানুষ বুঝবে, মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে? বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি কিছু লাগে কি? এমন বিপর্যের মুখোমুখি হয়েও যদি আমরা সেটা বুঝতে না পারি তবে মানুষ হিসেবে আমরা সত্যি অযোগ্য।

পৃথিবীর ফুসফুসে আজ অক্সিজেনের ঘাটতি। আসুন আমরা পৃথিবীটাকে বাঁচতে সুযোগ দিই।করোনা রোগী যা হারায় তা হচ্ছে প্রকৃতি প্রদত্ত অক্সিজেন গ্রহণে অক্ষমতা। তাকে কিনে গ্রহণ করতে হয় অক্সিজেন যদি টাকা থাকে। না হলে অক্সিজেনবিহীন অবস্থায় হয়ত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়। অথচ অআমরা পরিবেশ বিপর্যয়ের মাধ্যমে বন বাদাড় উজাড় করে পৃথিবীকে অক্সিজেন মুক্ত করে যাচ্ছি। একজন করোনা রোগীই জানেন অক্সিজেন তার জন্য কত মূল্যবান!)

প্রকৃতিতে যত ঘটনা ঘটছে, তা নির্দিষ্ট সূত্র অনুযায়ীই ঘটে চলেছে। ...এগুলো কোনো ব্যক্তি কোন্ অবস্থানে থেকে কী রকম দেখছেনতার উপর নির্ভর করেনা। ব্যক্তির অবস্থা এবংঅবস্থান পরিবর্তন হলে হয়তো তিনি ঘটনা একটু অন্য রকম দেখেন,কিন্তু ঘটনাগুলো প্রকৃতির অভিন্ন সৃত্র অনুযায়ীই ঘটে) বিচি, মার্চ, ২০২০, বর্ষ ৪, সংখ্যা ৬, পৃঃ ২০)।

গণিত নামের সর্বাঙ্গীন সুন্দর ও সার্বজনীন ভাষায় প্রকৃতির রহস্যগুলোকে ছন্দোবদ্ধ করার প্রয়াস নিউটন দেখিয়েছিলেন প্রথম ।(বিচি প্রাগুক্ত পৃঃ ২০)

প্রকৃতি-দুঃখ নাও-সুখ দিয়ে

মানুষ এখানে বিশাল অভাবকে মোকাবেলা করতে গিয়ে যাচ্ছেতাই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার জন্য প্রকৃতির আক্রোশের শিকার হচ্ছে। আবার এ আক্রোশের প্রভাব গিয়ে পড়ছে তার সীমারেখার পার্শ্বে প্রাণিকুলের পরে। এতে অন্যরা প্রকৃতিকে লোভে ব্যবহার না করেও আক্রোশের আগুনে জ্বলছে ঠিকই। তবে তারা দোষে দৃষ্ট নয়।

পাহাড় কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে তা ধসে যাচ্ছে। যে খাড়া পাহাড় সূর্যের তাপ, বাতাস, প্রবল বৃষ্টিকে নিজের শরীরে নিয়ে প্রকৃতির ক্ষয় রোধ করত, সেই পাহাড় ক্ষয়ে যাওয়ায় তাপের চাপে বাতাসে প্রচুর বালু ও মাটিবাহিত হচ্ছে। উপকূলে পলি জমে জলস্তর উঁচু হচ্ছে। নদী-নালা, সাগরের সঙ্গমপথ ভড়াট হচ্ছে। উজান জলস্রোতে পলি ভেসে আসতে থাকায় নদী মরেছে। এতে ভয়ংকর প্রভাবে পড়েছে আমাদের পরিবেশ। এসবের পেছনেও ক্রীড়ানক হিসেবে কাজ করছে আমাদের সীমিত সীমারেখায় বসবাসকারী অধিক জনসংখ্যা।

যারা কিনা নিজেদের ভোগ-বিলাসে প্রকৃতির সামান্য সম্পদের ওপর হামলে পড়ছে অহরহ। বসতবাটি, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল, মন্দির-মসজিদ করতে গিয়ে জমি বা মাটি টিকছে না। শিল্প ও বিদ্যুৎ, রাস্তা এবং যানবাহন গড়তে গিয়ে মাটি, জল, জলজসম্পদ ও বায়ু টিকছে না। যানবাহন আমাদের নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। আমরা বেঁচে আছি যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে। যেজন্য বলতে পারি,

শরীরটাকে নদী ভেবে দেখ, জলের ধারা বটে,

কখনও তা উথাল-পাথাল, কখনও গড়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।


এ অঞ্চলের তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণে এ পর্বতের ভূমিকা রয়েছে। নিরাশার কথা হল, ১৯৭০ সালের আগে ৫০ বছরের হিসেবে এ পর্বতের প্রায় ১৫ শতাংশ বরফ গলে গেছে। অর্থাৎ ১৯০০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলেছে।

সেজন্য এ এলাকার ঠাণ্ডার পরিমাণও কমেছে। একটি হিসাব দাবি করেছে, প্রতি দশকে এ এলাকায় ১টি ঠাণ্ডার রাত এবং ১.২টি ঠাণ্ডার দিন যেমন কমেছে, আবার একই ধারায় ওই সময়ে গরমে গড়ে ১.৭টি রাত এবং ১.২টি দিন বেড়েছে। আমাদের দেশে দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকলেও আমাদের রয়েছে খরা এবং বন্যা।

শৈত্যপ্রবাহ ও দাবদহ। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয় নিয়ন্ত্রিত না হলেও তার ক্ষিপ্রতা সৃষ্টিতে আমাদের বিস্তর ভূমিকা থাকে সবসময়। আমাদের বায়ুদূষণের ঘনত্ব এতটাই যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুলের সৌরভ ১০-১২ শত মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়; কিন্তু এখন সেই দূরত্ব কমে হয়েছে ২-৩ শত মিটার পর্যন্ত। ফুল কমে গেছে।

পতঙ্গ কমেছে সঙ্গত নিয়মে মধু উৎপাদনও কমে গেছে। যার জন্যও মানুষ দায়ী। ১৯৯৪ সালে দেশে মধু উৎপাদন হয়েছিল ৪৩৭.৪৭৮ টন। মাত্র চার বছর ব্যবধানে ১৯৯৮ সালে তার উৎপাদন ছিল ৩৯৩.৫০ টন।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকলে বাড়তি জনবসতি কখনও বোঝা হয় না। আবার শিল্পায়নের যুগে যদি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ থাকত তবে এ জনসংখ্যার প্রতিজনের দুটি হাতকে সক্ষম বা কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা গেলে তা হতো আশীর্বাদের। 

প্রকৃতিতে মানুষ হল উন্নত বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ প্রকৃতির অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করেছে স্রেফ নিজেদের প্রয়োজনে। প্রকৃতির অনেক রহস্যের নিগূঢ়তাকে জেনেছে। এজন্য মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে তার সঙ্গে এক ধরনের সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়েছে। বলতে গেলে এ মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতির পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরবর্তী ঘটনার কারণে যেমন সমাজ সৃষ্টি হয়েছে আবার যুক্ত সামাজিক ব্যবহারের ফলে প্রকৃতিকে যাচ্ছেতাই ভোগ করে চলেছে।

আর প্রকৃতির রুষ্টতার কারণ ঠিক এখানেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে যে বৈষয়িক পরিবর্তন তা মানুষের জন্য। এমনকি তার জন্য প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণিকুলের ওপরে যে রুষ্টতা অথবা শান্তিময়তা তা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রভাব। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজকের প্রকৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য যথাযথ বাসযোগ্য হিসেবে রেখে যাওয়াও আমাদের এ প্রজন্মের মানুষের অঙ্গীকার।

সেজন্য প্রকৃতির ওপরে মানুষের প্রভাব, প্রকৃতিকে স্বাভাবিকতায় চলতে দিয়ে বিজ্ঞান-সমাজ এবং সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে। শোষণ, বিস্তীর্ণ দূষণ, ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা পরিহার করে পরিবেশকে সুসংহত করে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান কাজনিয়তির জন্য আমাদের নিত্যপ্রার্থনা হোক, প্রকৃতি, আমাদের শান্তি দাও, অশান্তি দূর করে। যেন

প্রকৃতি তুমি চিতার দাহিকায় ঝলসে গেলেও

আমার শিখায় ছড়াও তোমার স্নিগ্ধ সবুজ আলো।

 এবার বেনু গ্রহানু (এস্টোরয়েড)-কে জানার উদ্দেশ্যে অসিরিস-আরএক্স এর মহাকাশ মিশন

অসিরিস-আরএক্স মহাকাশাযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য বেনু নামের এক গ্রহানু বা এস্টোরয়েডকে জানা। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ধারণা পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর এই বেনু নামের গ্রহানু বা এস্টোরয়েডের পৃথিবীকে আঘাত করার সম্ভাবনা আছে। অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাবনাও (২,৭০০ ভাগের ১ ভাগ)যদি সত্যি হয় তবে ২১৭৫ সাল থেকে ২১৯৯ সালের কোন এক সময়ে বেনুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ ঘটে যেতে পারে। মানব সভ্যতা ধ্বংসের এই নিম্নতম সম্ভাবনা নিয়েও তাই এতো আয়োজন।

আর নাসার এ অভিযানের সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২০ সালের দিকে অসিরিস-আরএক্স মহাকাশাযানটি এস্টোরয়েড বেনুকে স্পর্শ করে সেখান থেকে তথ্য-উপাত্ত পাঠাবে। আর সে তথ্য-উপাত্ত পৃথিবীতে এসে পৌঁছুবে সেপ্টেম্বর২০২৩ সালের দিকে।

পৃথিবীর সাথে এস্টোরয়েডস বা গ্রহানুপুঞ্জের সংঘর্ষ

গবেষণাপত্রটি ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে উপস্থাপন করা হয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানের অন্যতম সংগঠন আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নে।বিষয়টি বেশ পুরানো এবং জানা। কিন্ত পরীক্ষালব্ধ উপস্থাপনাটি নতুন এবং বিস্ময়কর। 

আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রস্থের একটি বিশাল আকৃতির গ্রহানু বা এস্টোরয়েড মেক্সিকোর ইউকাটান পেনিনস্যুলায় ঘন্টায় প্রায় ৮৫,০০০ কিলোমিটার বেগে আঘাত করেছিল। এস্টোরয়েডের এই পতনের ফলে মেক্সিকো এবং সংলগ্ন এলাকায় ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে ভূতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণা করছেন অনেকদিন থেকেই।

এই বিশাল আকৃতির গ্রহানুর আঘাতের ফলেই যে ১০০ কিলোমিটার চওড়া ও ৩০ কিলোমিটার গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল সেটিও অকাট্য প্রমানেই আজ স্বীকৃত। এই বিশাল গ্রহানু বা এস্টোরয়েড আঘাতের ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে হিরোশিমা নগরীর ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে ১০০ বিলিয়ন গুন শক্তিশালী।

কিন্ত আমেরিকার মিসিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রথমবার দেখিয়েছেন১৪ কিলোমিটার প্রস্থের এই বিশাল গ্রহানু বা এস্টোরয়েড আঘাতের ফলে যে বিশাল সুনামি বা সামুদ্রিক ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছিল তা শুধু অভাবনীয় নয়অকল্পনীয়ও বটে।

বিজ্ঞানের সব তত্ত্ব বা থিউরি মেনে নিয়ে মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছেসে সময়ে প্রায় ১ কিলোমিটার উচ্চতার সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। গ্রহানু বা এস্টোরয়েড আঘাতের ২৪ ঘন্টার মধ্যে গালফ অব মেক্সিকো হয়ে সমস্ত আটলান্টিক মহাসাগর এবং মধ্য-আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়েছিল এ বিশাল ঢেউ। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত জলরাশিতে আছড়ে পড়েছিল এই সুনামি।

যেখানে গ্রহানু বা এস্টোরয়েড আঘাত করেসেখানে তেমন জল ছিল না সে সময়ে। ফলে শুকনো আবর্জনার ধূলোকণা ৬,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলেসে সময়ে জীবিত প্রাণী ও উদ্ভিদ অক্সিজেনের অভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর জলবায়ু বিশেষকরে তাপমাত্রাও কমে গিয়েছিল ১৪ থেকে ২৯ ডিগ্রী ফারেনহাইটের মতো। ডাইনোসর বিশেষজ্ঞগন পৃথিবী থেকে ডাইনোসরের বিলুপ্তির জন্য ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে মেক্সিকোতে ঘটে যাওয়া এই গ্রহানু বা এস্টোরয়েড পতনকেই দায়ি করে থাকেন।

মানব সভ্যতার সৌভাগ্য যেএই ৬৬ মিলিয়ন বছরেও এতো বড় গ্রহানু বা এস্টোরয়েড পতনের অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়বার দেখতে হয়নি। যদিও সে সম্ভাবনা যে নেইসেটিও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারেননি এখন পর্যন্ত।

আমাদের সৌরজগতে ছোট বড় অসংখ্য গ্রহানু বা এস্টোরয়েড বা উল্কাপিন্ড ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রায় প্রতিটি গ্রহের সাথে সাথে সূর্যকে আবর্তন করেই। সূর্যকে প্রদীক্ষণ করছে এ রকম অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির বস্ত সাধারণত তিন ধরনের হয়কমেটসএস্টোরয়েডস এবং মেটোরয়েডস।

সাধারণ এবং সহজ করে বললেযেগুলোর আকৃতি ১ মিটারের কম সেগুলো মেটোরয়েডস। যেগুলো গ্যাস আর বরফকণায় তৈরী সেগুলোকে বলা হয় কমেটস। আর বড় আকৃতির গ্রহানুকে বলা হয় এস্টোরয়েড।

অপেক্ষাকৃত কম অক্ষ-উৎকেন্দ্রিক দূরত্বের জন্য সাধারণত গ্রহানু বা এস্টোরয়েডগুলো মংগল ও বৃহস্পতিকে ঘিরেই আবর্তণ করে থাকে। জানা গেছে১ কিলোমিটারের বড় আকৃতির গ্রহানু বা এস্টোরয়েড যারা শুধু মংগল ও বৃহস্পতি গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরছেতাদের সংখ্যাই ১.১ মিলিয়ন থেকে ১.৯ মিলিয়নের মতো।

আমাদের পৃথিবীকে আবর্তণ করছে এমন গ্রহানু বা এস্টোরয়েডের সংখ্যাও কম নয়। ২০১৬ সালের জুন মাসের এক মহাকাশ ম্যাগাজিন থেকে জানা যায়১৪,৪৬৪ গ্রহানু বা এস্টোরয়েডস পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। এদের মধ্যে আবার ৯০০ থেকে ১০০০ গ্রহানু বা এস্টোরয়েডস আছে যাদের আকৃতি ১ কিলোমিটারের বেশী চওড়া। 

এ উদ্বেগজনক তথ্য থেকে পৃথিবীর অস্তিত্ব ও অনিশ্চয়তা নিয়ে সকলের মতো মহাকাশবিজ্ঞানীরাও উদ্বিগ্ন। তাই তো গ্রহানু বা এস্টোরয়েডস নিয়ে গবেষণা হচ্ছে প্রতিদিন। মহাকাশাযানগুলোও আবিষ্কার করছে নিত্য নতুন গ্রহানু বা এস্টোরয়েড।

২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তারিখে নাসার পাঠানো অসিরিস-আরএক্স মহাকাশাযান পৃথিবী থেকে ১১ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে একটি গ্রহানু বা এস্টোরয়েড এর ছবি তুলেছে। অসিরিস-আরএক্স যখন এই গ্রহানু বা এস্টোরয়েডের ছবি তোলে তখন তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র ৪৬ কিলোমিটার। তুলনায় অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এই গ্রহানু বা এস্টোরয়েডটিও কিন্ত অর্ধকিলোমিটার চওড়া।


Comments

Popular posts from this blog

ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথ্য ব্যাংক (বাংলাদেশ)

Science-Tech News

আধুনিক বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে মহাবিশ্বের জন্মোতিহাস