ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথ্য ব্যাংক (বাংলাদেশ)

 

এক নজরে কোয়ান্টামের প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য

কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে বিশাল কোনো বস্তু যেমন তারা ও ছায়াপথ এবং মহাবিস্ফোরণ সংক্রান্ত  বিশ্বতত্ত্বমূলক ঘটনার সুক্ষ্ণতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যায়।

পদার্থবিজ্ঞানের সুক্ষ্ণতাত্ত্বিক যেসব ক্ষেত্রে চিরায়ত নিউটনীয় বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, সেসব ক্ষেত্রে পদার্থগুলির ভৌত আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাবার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ব্যবহার করে থাকেন।

পারমাণবিক অথবা তার চেয়েও ছোট মাপের কোনো ভৌত ব্যবস্থায়, খুব নিম্ন অথবা খুব উচ্চ শক্তিতে, অথবা অতিশীতল তাপমাত্রায় চিরায়ত এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের বিশ্লেষণের মধ্যে প্রায়শই পার্থক্য দেখা যায়।

কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান রসায়ন, আণবিক জীববিজ্ঞান, ইলেক্ট্রনিক্স, কণা পদার্থবিজ্ঞান, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিবিদ্যার আধুনিক উন্নয়নের ভিত্তি, এবং বিজ্ঞানের এই শাখাগুলো বিগত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে রূপান্তরিত করেছে।

যে প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম মৌল বানিয়ে থাকেন

প্রকৃতির কোথাও নেই-এমন মৌল ল্যাবরেটরিতে

প্রকৃতিতে কোথাও পাওয়া যায় না- এমন ২৪টি মৌল ল্যাবরেটরিতে বানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

পর্যায় সারণিতে দেখা যায়, অগানেসন হচ্ছে সর্বশেষ মৌল- যার পারমাণবিক সংখ্যা ১১৮। এই ১১৮টা মৌলই মানুষ কোনো না কোনো সময় পর্যবেক্ষণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ল্যাবরেটরিতে ১১৯ বা পরের মৌলগুলো বানানো যাবে?

পর্যায় সারণিতে পর্যায় বা সারি আছে ৭টা। ১১৮ নম্বর মৌল আবিষ্কারের পর ৭টা পর্যায়ই পূর্ণ হয়ে গেছে। এর পরের মৌল, মানে ১১৯ বা পরের কোনো মৌল আবিষ্কার হলে তার অবস্থান হবে অষ্টম পর্যায়ে। মজার ব্যাপার হলো, শুরু থেকেই বর্তমান রূপের পর্যায় সারণির পর্যায় ছিল ৭টা। তাই অষ্টম পর্যায় একটা বড় ঘটনাই হবে পর্যায় সারণির জন্য। যদি ইলেকট্রন বিন্যাস দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে, ১১৯ নম্বর মৌল পাওয়া সহজ হওয়ার কথা নয়। নতুন পর্যায় শুরু করাও কঠিন হবে।

যদি কৃত্রিমভাবে ১১৯ নম্বর মৌল বানাতে হয় তাহলে ল্যাবরেটরিতে প্রথমে লাগবে বার্কেলিয়াম। বার্কেলিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ৯৭ যা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন হয়, খুবই তেজস্ক্রিয় মৌল। কয়েক মিলিগ্রাম বার্কেলিয়াম নিয়ে তার ওপর আলোর বেগের একদশমাংশ বেগে টাইটেনিয়াম আয়ন ছুড়তে হবে। এভাবে যদি টানা এক বছর টাইটেনিয়াম আয়ন ছোড়া হয়, ১০১৮ টা টাইটেনিয়াম আয়নের আঘাতে একটা ১১৯ পারমাণবিক সংখ্যার পরমাণু উৎপন্ন হতে পারে। এই উৎপাদন বছরের যেকোনো মুহূর্তে হবে, তাই পুরো বছরই নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, কারণ এটা বলা কঠিন যে ১১৯ মৌল কতক্ষণ স্থায়ী হবে। আগের মৌলগুলোর অভিজ্ঞতা বলে মিলি সেকেন্ডের ভগ্নাংশ স্থায়ী হবে, তারপর একটা আলফা আর একটা গামা কণা উৎপন্ন করবে, যা গিয়ে আঘাত করবে চারপাশে রাখা সিলিকন ডিটেক্টরে, ধরা পড়বে প্রথম ১১৯ নম্বর মৌল। শুধু পৃথিবীর নয়, সম্ভবত মহাবিশ্বেরই প্রথম হবে, যদি না কোনো এলিয়েন আগেই বানিয়ে থাকে।

এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান যে, ১১৯-কে খুঁজে পাওয়া সহজ কোনো কাজ হবে না। জার্মানির বিজ্ঞানীরা ২০১২ সালে কয়েক মাস এই পদ্ধতিতে চেষ্টা করেছেন। রাশিয়া আর জাপানের বিজ্ঞানীরাও চেষ্টা করেছেন ১২০-কে খুঁজতে। এখন পর্যন্ত কেউ পারেননি ১১৯ বা ১২০ উৎপাদন করতে।(বিজ্ঞান চিন্তা)

প্রয়োজন নতুন জগতে নতুন বিজ্ঞান

মেন্ডেলিভ ১৮৬৯-এ পর্যায় সারণি প্রকাশ করার পর থেকে প্রতি দুই থেকে তিন বছরে গড়ে একটা করে মৌল যোগ হয়েছে পর্যায় সারণিতে। টেনেসাইন নামের সর্বশেষ নতুন মৌল শনাক্ত হয়েছিল ২০১০ সালে যার পারমাণবিক সংখ্যা ১১৭। আধুনিক কোনো গবেষণাগারে কাঠখড় পুড়িয়ে ১১৯ বা ১২০ হয়তো কৃত্রিমভাবে পাওয়া যাবে তাতে প্রয়োজন হতে পারে অনেক সময়, অনেক অর্থ এবং অনেক ধৈর্যশীল, কিন্তু এর পরের মৌল, অর্থাৎ ১২১ বা আরও বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌল আমাদের বর্তমান জানা প্রযুক্তিতে পাওয়া সম্ভব না বলেই মনে করছেন বেশির ভাগ বিজ্ঞানী। এ জন্য দরকার হবে নতুন ধরনের কোনো প্রযুক্তি।

নতুন মৌল না খুঁজে তাঁরা চেষ্টা করছেন ইতিমধ্যে বানানো মৌলগুলোর ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না।

তাই অনেকগুলো কৃত্রিম মৌল আবিষ্কার করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই নতুন মৌল খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছে। ১১৮তম মৌল যার নামে, ইউরি অগানেসিয়ান, তিনি এখনো নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাশিয়ার জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। তিনি জানিয়েছেন, নতুন একটা মৌল খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে তাঁরা এখন আরও ভারী একটা পরমাণু বানানোর চেয়ে এর মধ্যে আবিষ্কৃত পরমাণুগুলোর ধর্ম নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আরও ভারী একটা মৌল খুঁজে পাওয়াকে আমি অসম্ভব বলছি না, কিন্তু বর্তমানে আমি এর কোনো উপায় জানি না।

রিচার্ড ফাইনম্যানের হিসাব

 রিলেটিভিস্টিক ডিরাক সমীকরণ ব্যবহার করে রিচার্ড ফাইনম্যানের হিসাবমতে, ১৩৭ নম্বর মৌল হলো সেই মৌল, যার পরে ইলেকট্রনের সংখ্যাধিক্যের কারণে আর নিরপেক্ষ মৌল সম্ভব না তাঁর দাবীঃ এই মৌলের পরে আর মৌল যোগ হবে না । অনেকের ধারণা, ১৩৭ নম্বর পরমাণুই হলো পর্যায় সারণির সর্বোচ্চ সীমা। কিন্তু পরে কোয়ান্টাম ইলেকট্রডাইনামিকস ব্যবহার করে দেখা গেছে, এই সংখ্যাটা হবে ১৭৩। এই হিসাব আরও বেশি নিখুঁত।

তবে সব হিসাব বলে, ১১৯ আর ১২০ নম্বর মৌল পাওয়া সম্ভব। তাই এখন সবার অপেক্ষা পর্যায় সারণির ওই দুই সদস্যকে খুঁজে পেতেই। আমাদের জীবদ্দশাতেই আমরা অনেকগুলো মৌল পর্যায় সারণিতে যুক্ত হতে দেখেছি। হয়তো এই দুটোও দেখতে পারব অচিরেই। কে জানে, আরও অনেকগুলো পরমাণুকে হয়তো আমরা যুক্ত হতে দেখতে পারব! আবার কারো মতে, আর সম্ভবপর নয়। সূত্র: নেচার, আইইউপিএসি, উইকিপিডিয়া

লেখক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং, যুক্তরাষ্ট্রhttps://www.bigganchinta.com/feature/পর্যায়-সারণির-শেষ-কোথায়

আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিকাশে মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানের ভূমিকা

জাবির ইবনে হাইয়ান বস্তু জগতকে প্রধানতঃ তিন ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম ভাগে স্পিরিট, দ্বিতীয় ভাগে ধাতু এবং তৃতীয় ভাগে যৌগিক পদার্থ। তাঁর এ আবিষ্কারের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী বিজ্ঞানীরা বস্তুজগৎকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা-১. বাষ্পীয়, ২. পদার্থ ও ৩. পদার্থ বহির্ভূত। জাবির কর্পূর, আর্সেনিক ও এমোনিয়াম ক্লোরাইডসহ এমন সব বস্তু বিশ্ব সভ্যতার সামনে তুলে ধরেন, যেগুলোকে তাপ দিলে বাষ্পে পরিণত হয়। এছাড়া তিনি এমন কিছু মিশ্র ও যৌগিক পদার্থ তুলে ধরেন যেগুলোকে অনায়েসে চূর্নে (পারমাণবিকতায়) পরিত করা যায়। নির্ভেজাল বস্তুর পর্যায়ে তিনি তুলে ধরেন সোনা, রূপা, তামা, লোহা, দস্তা প্রভৃতি।


জাবির ইবনে হাইয়ানই সর্ব প্রথম নাইট্রিক এসিড আবিষ্কার করেন। তিনি 'কিতাবুল ইসতিতমাস' এ নাইট্রিক এসিড প্রস্তুত করার ফর্মুলা বর্ণনা করেন। নাইট্রিক এসিডে স্বর্ণ গলে না। সালফিউরিক এসিডও তাঁর আবিষ্কার। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মিশ্রনে স্বর্ণ গলানোর ফরমুলা তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। জাবির ইবনে হাইয়ান নানাভাবেই তাঁর রাসায়নিক বিশ্লেষণ বা সংশ্লেষনের নামকরণ বা সজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মিশ্রনে স্বর্ণ গলানোর পদার্থটির নাম যে "একোয়া রিজিয়া" এ নামটিও তাঁর প্রদত্ত।

পাতন, উর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভস্মীকরণ, গলন, বাষ্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা অনুশীলন গবেষণার কি কি রূপান্তর হয় এবং তাঁর ফল কি তিনি তাও বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি চামড়া ও কাপড়ে রঙ করার প্রণালী, ইস্পাত প্রস্তুত করার পদ্ধতি, লোহা, ওয়াটার প্রুফ কাপড়ে বার্নিশ করার উপায়, সোনার জলে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লৌহের ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন।
জাবির ইবনে হাইয়ান স্বর্ণ ও পরশ পাথর তৈরী করতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্বর্ণ কিংবা পরশ পাথরের লোভী ছিলেন না। ধন সম্পদের লোভ লালসা তাঁকে সভ্যতা উন্নয়নে ও গবেষণার আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পদস্খলন ঘটাতে পারেনি। দুর্দান্ত সাহসী জাবির ইবনে হাইয়ান স্বর্ণ ও পরশ পাথর তৈরী করতে গিয়ে আজীবন যেখানেই গিয়েছেন দুর্যোগ, দুশ্চিন্তা ও মৃত্যুর সাথে লড়াই ছাড়া সুখ শান্তির মুখ দেখতে পারেননি। জাবিরের মতে সোনা, রূপা, লোহা প্রভৃতি যত প্রকার ধাতু আছে, কোন ধাতুরই মৌলিকতা নেই। এসব ধাতুই পারদ আর গন্ধকের সমন্বয়ে গঠিত। খনিজ ধাতু খনিতে যে নিয়মে গঠিত হয় সে নিয়মে মানুষও ঐ সব ধাতু তৈরী করতে পারে। অন্য ধাতুর সংগে মিশ্র স্বর্ণকে বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি তিনিই আবিষ্কার করেন।


জাবির এপোলিয়ানের আধ্যাত্মিকবাদ, প্লেটো, সক্রেটিস, এরিস্টটল, পিথাগোরাস, ডিমোক্রিটিস প্রমুখের গ্রন্থের সংগে পরিচিত এবং গ্রীক ভাষায় সুবিজ্ঞ ছিলেন। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান, ইউক্লিড ও আল মাজেস্টের ভাষ্য, দর্শন, যুদ্ধবিদ্যা, রসায়ন, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও কাব্য সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তিনি সীমিত সংখক পৃষ্ঠায় রচিত দুই হাজারেরও বেশী গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যেসব তত্ত্ব পেয়েছেন, তাঁর ফলাফলই ছিল গ্রন্থের বিষয়বস্তু। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রণীত গ্রন্থাবলীর মধ্যে রসায়ন ২৬৭ টি, যুদ্ধাস্ত্রাদি ৩০০টি, চিকিৎসা ৫০০টি দর্শনে ৩০০ টি, কিতাবুত তাগিদের ৩০০টি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ৩০০ পৃষ্ঠার ১টি, দার্শনিক যুক্তি খন্ড ৫০০টি উল্লেখযোগ্য।

 

 

 

 


Comments

Popular posts from this blog

Science-Tech News

আধুনিক বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে মহাবিশ্বের জন্মোতিহাস