কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ইতিকথা
কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান
কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (ইংরেজি: Quantum mechanics) বা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান (ইংরেজি: Quantum physics) আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা-যা পরমাণু এবং অতিপারমাণবিক কণার/তরঙ্গের মাপনীতে পদার্থের আচরণ বর্ণনা করে। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে বিশাল কোন বস্তু যেমন তারা ও ছায়াপথ সম্পর্কিত বিষয় ব্যাখ্যা করা যায় তেমনি স্ট্যান্ডার্ড মডেলভিত্তিক বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বমূলক মহা বিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) এর ঘটনাও ব্যাখ্যা করা যায়।
উল্লেখ্য, পদার্থবিজ্ঞানের যেসব
ক্ষেত্র ক্লাসিক্যাল (চিরায়ত) নিউটনীয় বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না,
সেসব ক্ষেত্রে পদার্থগুলির জড়তাত্ত্বিক ভৌত (অস্বাভাবিক) আচরণ সম্পর্কে ধারণা
পাবার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ব্যবহার করে থাকেন। কোয়ান্টাম
বলবিজ্ঞান রসায়ন, আণবিক জীববিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক্স, কণা পদার্থবিজ্ঞান, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিবিদ্যার আধুনিকায়নের ভিত্তি। বিজ্ঞানের
কোয়ান্টামভিত্তিক এই শাখাগুলো বিগত পঞ্চাশ বছরব্যাপী পৃথিবীকে রাতারাতি এনালগ
থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত করেছে। (সূত্রঃhttps://bn.wikipedia.org/wiki//কোয়ান্টাম_বলবিজ্ঞান)।
আইজাক নিউটন ১৬৮৬ সালে তাঁর বিখ্যাত বই Philosophiae Naturalis Principia Mathematica, সংক্ষেপে প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা-তে চিরায়ত বলবিজ্ঞানের মূলসূত্রগুলি লিপিবদ্ধ করেন। এতে চিরায়ত (ক্লাসিক্যাল) বলবিজ্ঞান আমাদের চারপাশের অপারণমাবিক জগতের অনেক ঘটনা কিভাবে প্রায় নির্ভুল ব্যাখ্যা প্রদান সক্ষম তা তুলে ধরা হয়েছে। এরপর প্রায় দুইশ বছর ধরে এই সূত্রগুলিই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমস্ত ঘটনাবলির ব্যাখ্যার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
উল্লেখ্য, ১৯শ শতকের শেষের দিকে এসে পরমাণুর ইলেক্ট্রনীয় গঠন ও আলোর ধর্মের উপর কিছু আবিষ্কার নিউটনীয় বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রায় একই সময়ে পদার্থবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন যে, চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ধারণাগুলি অতিপারমাণবিক ক্ষুদ্র কণাবস্তুর ওপরেও প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।
এছাড়া, ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনও বুঝতে পারেন যে, ক্লাসিক্যাল (চিরায়ত) বলবিজ্ঞানের ধারণাগুলি আলোর ন্যায় অত্যন্ত দ্রুত গতিবেগসম্পন্ন বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। তিনি এটা ব্যাখ্যা করার জন্য রচনা করেন আপেক্ষিকতাভিত্তিক বলবিজ্ঞান নামের নতুন বিজ্ঞান পাঠ্য। ফলে সৃষ্টি হয় নিউটনীয় বল বিদ্যার সাথে আইনস্টাইনীয় বলবিদ্যার দূরত্ব বা স্থবিরতা।
এমতাবস্থায়, এহেন বৈজ্ঞানিক স্থবিরতা নিরসনকল্পে ১৯০০ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে তৎকালীন খ্যাতনামা মাক্স প্লাংক, নিল্স বোর, আলবার্ট আইনস্টাইন, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, লুই দ্য ব্রয়ি, এর্ভিন শ্র্যোডিঙারসহ বেশ কিছু পদার্থবিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রয়াসে পরমাণুর ইলেক্ট্রনীয় গঠন ও আলোর ধর্মের উপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত বিষয়াদির যথাযথ ব্যাখ্যাসম্বলিত অতিপারমাণবিক ক্ষুদ্র কণাবস্তুর ওপর কার্যকর যে বিশেষ বলবিদ্যা উদ্ভাবন করেন তাকে পদার্থ বিজ্ঞানে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান বলা হয়।
উল্লেখ্য, আপেক্ষিকতাবাদের সাথে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের কিছু বৈসাদৃশ্যমূলক ছোটখাটো সৃষ্ট অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন করে উভয় তত্ত্বকে সার্বজনীন রূপ দেয়ার তথা একত্রীকরণের ব্যাপারে বর্তমানে জোর তাত্ত্বিক গবেষণা চলছে।
যেভাবে সূত্রপাত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূত্রপাত:
কিন্তু স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তত্ত্বটি সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে বললেন, চার্জিত কণা নির্দিষ্ট কক্ষপথে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরলে বিদ্যুত-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা তার চার্জ বিকিরণ করে। এই চার্জই নিউক্লিয়াসের কাছ থেকে ইলেকট্রনকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখতো। কাজেই এভাবে যদি ইলেকট্রনটি চার্জ ত্যাগ করতে থাকে তাহলে আস্তে আস্তে ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসের কাছে আসতে থাকবে এবং একসময় নিউক্লিয়াসের গায়ে আছড়ে পড়ার কথা। ইলেকট্রন যদি নিউক্লিয়াসের উপর গিয়ে পড়ে তাহলে পরমাণুর ভারসাম্য ঠিক থাকার কথা নয়। অথচ প্রকৃতিতে পরমাণুর ভারসাম্য ঠিকই থাকছে,-অর্থাৎ ইলেকট্রন চিরায়ত নিয়মে নিউক্লিয়াসের উপর গিয়ে আচড়ে পড়ছে না। কিন্তু কেন? এর বৈজ্ঞানিক কারণটাই বা কী?
এতবড় একটা অসংগতির ফলে আরো একবার (তৃতীয়বার) বড় একটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো পদার্থবিজ্ঞান-কে। যেমনটা হয়েছিল কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণে, যেমনটা হয়েছিল আলোক তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যায়। দুই ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যার জন্য গুরু্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এবার কে ‘সোলার সিস্টেম অ্যাটম মডেল’ এর সৃষ্ট অসংগতি নিরসনে এগিয়ে আসবেন? বিজ্ঞানমহলে সংগত কারণে তখনকার সময়ে এ ধরণের প্রশ্ন উঁকি ঝুকি দিচ্ছিল। অবশেষে হাজির হলেন ডেনিশ বিজ্ঞানী নিলস বোর। বোর দেখলেন বিদ্যুত-চৌম্বকীয় তত্ত্ব দিয়ে তো রাদারফোর্ডের মডেল ব্যাখ্যা করা যায় না-এই ভেবে নিলস বোর বৈজ্ঞানিক প্লাঙ্ক-আইনস্টাইন প্রতিষ্ঠিত কোয়ান্টাম তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের মাধ্যমে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
নিলস বোর তৈরী করলেন এক নতুন তত্ত্ব। উদাহরণস্বরূপ মনে করি, আপনি আছেন পাঁচ তলায়। নিউক্লিয়াস আছে নিচতলায়। প্রত্যেক তলা নামতে আপনার খরচ হবে দশ টাকা। আপনার কাছে আছে পঞ্চাশ টাকা। আপনি দশটাকা খরচ করে এক তলায় নামলেন। এখানে আপনাকে থামানো হলো। আপনি এখানেই ঘোরাঘুরি করতে থাকবেন। আপনার কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। যখনই আপনি আরো দশ টাকা খরচ করবেন আপনাকে আরেক তলা নামিয়ে দেওয়া হবে। বোর তার তত্ত্বে এটাও বললেন যে, আপনি শুধু নামতেই থাকবেন তা না। আপনি আপনার টাকা বাড়াতে পারবেন। ধরুন আপনার কাছে আছে ত্রিশ টাকা আপনি আছেন তিন তলায়। হঠাৎ যদি কোনো কারণে আপনার দশ টাকা বেড়ে যায় তাহলে আপনার টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়ে যাবে চল্লিশ। তখন আপনি একলাফে চলে যেতে পারবেন চার তলায়। যখন সব টাকা শেষ হবে তখনি সরাসরি নামা যাবে নীচ তলায়, সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে নিউক্লিয়াসের ।
এখানে “আপনি” হলেন “ইলেকট্রন”। “নিচতলা” হলো “নিউক্লিয়াস” এবং আপনার কাছে যে “টাকা” আছে সেটা হলো “ইলেকট্রনের চার্জ” এবং যে “তলা”গুলোর কথা হয়েছে তা হলো “ইলেকট্রনের কক্ষপথ”। বোরের তত্ত্বমতে, ইলেকট্রন শক্তি ত্যাগ করতে পারে আবার গ্রহণও করতে পারে এবং সে তার শক্তি অনুযায়ী পরমাণুর যেকোনো কক্ষপথে থাকতে পারে।
এই নতুন তত্ত্ব আগের সব তত্ত্বকে বাতিল করে দিলো এবং এক্ষেত্রে মুখ্য চরিত্রে থাকা কোয়ান্টাম তত্ত্বে ম্যাক্স প্লাঙ্ক বলেছিলেন, কৃষ্ণবস্তু একটানা শক্তি বিকিরণ করতে পারে না। শক্তি আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। ছোট ছোট দল বেঁধে। যাকে বলা হয় প্যাকেট বা ফোটন। বোর অনেকটা একই কথা বললেন তাঁর তত্ত্বে। পরমাণুর কক্ষপথও আলাদা আলাদা। ইলেকট্রন যেকোনো সময় যেকোনো কক্ষপথে থাকতে পারে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, “একটি পরমাণুর যে একাধিক কক্ষপথ রয়েছে তার সবগুলোতে ইলেকট্রন একইসাথে একইসময়ে থাকতে পারে!” ইলেকট্রনের এই অবস্থানের অনিশ্চয়তাই কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্য।
তথ্য সূত্র : বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যা ও ব্যক্তিত্ব : ডঃ শঙ্কর সেনগুপ্ত।
পুরাতন পৃথিবীতে নতুন বিজ্ঞানের শুরু যেভাবে
১৭৯২ সালে টি. ওয়েজউড লক্ষ্য করেছিলেন যে তাপিত সকল বস্তু একই তাপমাত্রায় রক্তিম হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এই অনুমানের সঠিক ব্যাখ্যা দেন কারচফ। ১৮৫৯ সালে তিনি তাপ-গতি তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে বিকিরণ শক্তি ও শোষণ সহগের অনুপাত কেবল মাত্র কম্পাংক ও তাপমাত্রার অপেক্ষক, বস্তুর চরিত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। ১৮৯৩ সালে ডব্লু ভাইন আরেক ধাপ এগিয়ে দেখাতে সক্ষম হলেন বিকিরণ শক্তির সংখ্যা দু’টি। সংখ্যা দু’টি হল : কম্পাঙ্কের ত্রিঘাত ও কম্পাঙ্ক-তাপমাত্রার অনুপাতের অপেক্ষক।
মাক্স প্লাঙ্কের সময় কৃষ্ণবস্তু থেকে বেরিয়ে আসা বিকিরণের চরিত্র ব্যাখ্যা করা পদার্থবিদ্যায় এক বিরাট সমস্যা ছিল। সনাতনী তাপগতি বিদ্যা এই সমস্যা সম্পূর্ণভাবে সমাধান করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এ বিষয়ে কাজ করেছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী হেনরিক রুবেন, আর্নস্ট প্রিংসাইম, অটো লুথান প্রমুখ আরও কতিপয় বিজ্ঞানী; আর উত্সাহী তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন ডব্লু ভিন, লর্ড র্যালে এবং কে এইচ জিনস।
দিনটি ছিল ৭ অক্টোবর, ১৯০০ সাল। জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তখন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। হেনরিখ রুবেন্স তাঁর গবেষণা সহকর্মী। ওই দিন রুবেন্স আর তাঁর স্ত্রী বেড়াতে আসেন প্ল্যাঙ্কের বাড়িতে। সেখানেই রুবেন্স জানান, কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের একটা পরীক্ষার কথা। পরীক্ষা থেকে কী ফল পেয়েছেন, তা-ও বলেন। আসলে সমস্যাটা ছিল বিকিরণ-সংক্রান্ত। আদর্শ কৃষ্ণবস্তু, যে নাকি শোষণ করতে পারে তার ওপর পড়া সবটুকু আলো ও তাপশক্তি, তারপর সেই কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ করে আলোকরশ্মি। কিন্তু সেই বিকিরণপ্রক্রিয়া মেনে চলে না তখনকার পদার্থবিজ্ঞানের চিরায়ত দুটি গতিতত্ত্ব। সেই গতিতত্ত্বের একটা হলো নিউটনের গতিবিদ্যা এবং অন্যটা ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুত্গতিবিদ্যা। কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের ব্যাখ্যার জন্য অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী লুডভিক বোলজম্যান একটা সূত্র দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা পুরোপুরি সেই বিকিরণের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। অন্যদিকে জার্মান বিজ্ঞানী উইলেহেম ভিন একটা সূত্র দাঁড় করিয়েছিলেন। এ ছাড়া দুই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লর্ড রেলে ও জেমস জিনস আরও একটি সূত্র দাঁড় করান। কিন্তু কোনোটাই কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
সেদিন রুবেন্স প্ল্যাঙ্ককে বলেন, দীর্ঘ তরঙ্গের বিকিরণের ব্যাখ্যা ভিনের সূত্র দিয়েই করা যায়। কিন্তু ক্ষুদ্র তরঙ্গের জন্য সেটা অচল। আবার রেলে-জিনসের সূত্র দিয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গের বিকিরণ ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু দীর্ঘ তরঙ্গে রেলে-জিনস তত্ত্ব অচল। তার মানে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যার জন্য দুটো সমীকরণের দরকার হচ্ছে। অথচ সমীকরণ দুটি পরস্পরবিরোধী।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে যান রুবেন্স ও তাঁর স্ত্রী। প্ল্যাঙ্ক তখন সমস্যাটা নিয়ে বসে গেলেন টেবিলে এবং সেই দিনই পেয়ে গেলেন আনকোরা একটা সূত্র। এই সূত্র দিয়ে একই সঙ্গে ছোট ও বড় দুই ধরনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণই ব্যাখ্যা করা যায়। সূত্রটি প্ল্যাঙ্ক লিখলেন একটা পোস্টকার্ডে। তারপর সেটা পাঠিয়ে দিলেন রুবেন্সের কাছে। রুবেন্স সমীকরণের গুরুত্ব কিছুটা হলেও বুঝেছিলেন সেদিন।
১৯
অক্টোবর,
১৯০০। কোয়ান্টাম মেকানিক্স তথা পুরাতন পৃথিবীতে নতুন বিজ্ঞানের
জন্য এদিনটি এক ঐতিহাসিক দিন। জার্মান ফিজিক্যাল সোসাইটি একটা সভার আয়োজন করে।
সভার মূল বিষয়বস্তু কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের পরীক্ষালব্ধ ফলাফল। বরাবরের মতোই
বিজ্ঞানীরা সেদিনও ভিন ও রেলে-জিনসের সূত্রের সঙ্গে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল ষোলো আনা
মেলাতে পারলেন না। তখন প্ল্যাঙ্ক রুবেন্সকে বললেন, তাঁর
সমীকরণটা যেন বিজ্ঞানীরা যাচাই করে দেখেন। এ কথা বলে সেখান থেকে বাসায় ফিরে আসেন
প্ল্যাঙ্ক। পরদিন রুবেন্স প্ল্যাঙ্ককে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, তাঁর সূত্রটা অভ্রান্ত বলে রায় দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
তাহলে কি
পদার্থবিজ্ঞানের নতুন কোনো দ্বার খুলে গেল তাঁর হাতে? তাহলে
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটা মহাবিপ্লবের ইঙ্গিত করছে। নাকি প্ল্যাঙ্কের সূত্রে কোনো গলদ
লুকিয়ে আছে, যা তাঁর চোখে ধরা পড়ছে না? কিন্তু প্ল্যাঙ্ক নিজে কোনো গলদ খুঁজে পেলেন না। সেদিন সভায় যেসব
বিজ্ঞানী উপস্থিত ছিলেন তাঁরাও কোনো গলদ খুঁজে পাননি।
প্ল্যাঙ্ক
তখন অন্য পথে হাঁটলেন, তাঁর সূত্র দিয়ে ভিন ও রেলে-জিনস—দুটি সূত্রই
প্রতিপাদনের চেষ্টা করলেন। অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর সূত্র দিয়ে ভিনের সূত্র প্রতিপাদন
করা যায়। প্রতিপাদন করা যায় রেলে-জিনসের সূত্রও। শুধু তা-ই নয়, এটি
দিয়ে বোলজম্যানের পুরোনো সূত্রটিও প্রতিপাদিত হয়। অথচ তাঁর সূত্র চিরায়ত
পদার্থবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না। প্ল্যাঙ্ক তখন নিশ্চিত
হলেন বিজ্ঞান ইতিহাসের নতুন দ্বার তিনি খুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রকৃতির সম্পূর্ণ
মৌলিক একটি নিয়ম তিনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন।
প্ল্যাঙ্ক
দুই মাস ধরে নিজ সূত্রটা নিয়ে নিবিড় গবেষণায় মত্ত হলেন যাতে কোন প্রকার ভুল-ত্রুটি
খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। তেমন কোনো আলামত না পেয়ে তারপর অনেকটা আত্মবিশ্বাসে
বলীয়ান হয়ে প্ল্যাঙ্ক রাতারাতি একটা গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে ফেলেন। প্রবন্ধের
শিরোনাম ছিল, ‘অন দ্য থিওরি অব দ্য এনার্জি ডিস্ট্রিবিউশন ল অব দ্য
নরমাল স্পেকট্রাম’।
মাস কয়েক
পরে সে বছর ১৪ ডিসেম্বর জার্মান ফিজিক্যাল সোসাইটির অনুষ্ঠিত আরেকটা সভায় নিজের
প্রবন্ধটি পড়ে শোনালেন প্ল্যাঙ্ক। সেখানে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ওপর বিস্তারিত আলোচনা
করলেন তিনি।
প্ল্যাঙ্কের
অভিনব নতুন (কোয়ান্টাম) তত্ত্বটি উপস্থিত অনেক খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরই তৎক্ষণাৎ মেনে
নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকেই প্ল্যাঙ্কের নিছক “রোমান্টিক মনের অতিকল্পনা” ভেবে তত্ত্বটিকে গুরুত্ব দেননি । তাঁরা ভেবেছিলেন কিছুদিন তত্ত্বটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়তো চলবে, তারপর
কোনো একটা গরমিল বেরিয়ে পড়লে এমনিতেই সব আলোচনা থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল
উল্টো ঘটনা। দিন যত গড়াল কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত তত মজবুত হতে লাগল। কোয়ান্টাম
নামের অভিনব তত্ত্বের বিরোধী পক্ষের যেন আর্শিবাদ হয়ে উঠেন স্বয়ং স্বদেশী আলবার্ট
আইনস্টাইন এবং তাঁর সারগেদ সোয়ার্জসিল্ড প্রমুখ.....। তাঁরা বাঘের মত এমন হুমকার
দিয়ে উঠেন তাতেই প্ল্যাঙ্কের সব জারিজুরি যেন নিমিষে মিটে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু
বাঘের উপর টাঘ হয়ে আবির্ভূত হন নিল বোর বাহিনী। উল্টো তারা এমনভাবে গর্জে উঠেন
তাতেই বিশেষ থিওরীর স্থপতি আইনস্টাইন পর্যন্ত চুপসে যান। তবে সব সমস্যা তখনও
মিটেনি, বরং প্ল্যাঙ্ক যখন কোয়ান্টাম
নামীয় নতুন তত্ত্ব দিয়ে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সমস্যা সমাধান করছেন, ঠিক তখনই আরেকটা সমস্যা হাজির হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে। সেটা হলো
আলোক-তড়িৎক্রিয়া। ধাতব পাতের ওপর আলো ফেললে সেই পাত থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। কেন
হয়? এর গাণিতিক ব্যাখ্যা কী? এসব
প্রশ্ন নির্ঝন্ঝাট নিটনীয় স্থূল বল বিজ্ঞানের জগতে যেন জট পাকিয়েছিল। কারণ,নিউটনের
গতিতত্ত্বের পক্ষে এর ব্যাখ্যা দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। এমনকি ম্যাক্সওয়েল
বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তত্ত্বও এর ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তাহলে? তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আলো-কে শুধু তরঙ্গই ভাবতেন।
যেহেতু
আলোক-তড়িৎক্রিয়া আলোর কম্পাঙ্কের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সুতরাং আলোক তড়িৎক্রিয়ার
ব্যাখ্যা তরঙ্গতত্ত্বের ভেতরেই খুঁজতে হবে। কণা পদার্থবিদরা অনেকটা মুশকিলে পড়লেন
এই প্রশ্নে যে, তরঙ্গের পক্ষে কীভাবে সম্ভব একটা কণাকে ধাতুর ভেতর থেকে আলাদা করা?
আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়েই যা ব্যাখ্যা করা যায়
আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব ব্যবহার করে যদি আলোক-তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে কিছু তাত্ত্বিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব মতে আলোক-তড়িৎক্রিয়া সংঘঠিত হতে অনেক সময়ের প্রয়োজন, কারণ আলো নিরবিচ্ছিন্ন শক্তি হলে অনেক্ষণ ধরে ইলেকট্রনের ওপর পড়লে হয়তো ইলেকট্রন উত্তেজিত হয়ে এক সময় ছিটকে বেরিয়েও যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আলোক-তড়িৎক্রিয়া মুহূর্তের মধ্যেই সংঘঠিত হয় এবং তাতে মাত্র ন্যানো সেকেন্ড সময় লাগে। এত কম সময়ে তরঙ্গের পক্ষে সম্ভব নয় আলোক-তড়িৎক্রিয়া ঘটানো।
আলো যদি কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী ফোটন কণা হয়, তাহলে একটা ফোটন একটা মাত্র ইলেকট্রনকে আঘাত করবে। ইলেকট্রন ফোটন থেকে কিছু শক্তি ধার করে প্রবল বেগে বেরিয়ে যাবে ধাতব পরমাণু থেকে। এক্ষত্রে একটা ফোটনের শক্তি মাত্র একটা ইলেকট্রনই গ্রহণ করবে। অন্যকোনো ইলেকট্রনকে সেই শক্তির ভাগ সে দেবে না। তাই ইলেকট্রন সেই শক্তি নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারবে। অন্যদিকে আলোক-তড়িৎক্রিয়ার কালক্ষেপন না করার বৈশিষ্ট্য আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়েই শুধু ব্যাখ্যা করা যায়।
আলোর কণাকে শুধু “তরঙ্গ” (Wave) ধরে হিসাব করলে ইলেকট্রনের গতিশক্তি বাড়ানোর জন্য আলোর তীব্রতাও বাড়ানোর দরকার। এ ক্ষেত্রে যদি একটা ধাতুকে অনুজ্জ্বল বেগুনি আলো দিয়ে আঘাত করা হয় তাহলে আলোক তরঙ্গ গিয়ে ইলেকট্রনকে আঘাত করার ফলে একসময় ধীরে ধীরে ইলেকট্রন পরমাণু থেকে নির্গত হওয়ার কথা। যেহেতু তরঙ্গের শক্তি সব ইলেকট্রনের ভেতর ভাগ হয়ে যাচ্ছে, তাই একটা সময় এক সাথে অনেকগুলো ইলেকট্রন মুক্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত। কারণ, তরঙ্গের শক্তি ভাগ হয়ে যাচ্ছে বলে ইলেকট্রন অনুজ্জ্বল বেগুনি আলো থেকে খুব দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। তাই অনুজ্জ্বল বা কম তীব্রতার আলোতে ইলেকট্রনের বেগ কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ায় সেটা ঘটে না।
কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাথে আইনস্টাইনের একটা শত্রুতা শুরু থেকেই লেগে ছিল। আইনস্টাইন ঘোর বাস্তববাদী বিজ্ঞানী ছিলেন। কোনো অনিশ্চয়তায় বিশ্বাস করতেন না। কোয়ান্টাম এবং অনিশ্চয়তাবাদ যেন যমজ ভাই। একে অপরের পরিপুরক। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আইনস্টাইনকে কোয়ান্টাম তথা অনিশ্চয়তাবাদ মেনে নিতে হয়েছিল গবেষণার খাতিরে।পুরোপুরি মানতে না পারলেও আইনস্টাইনকেও এই তত্ত্ব ব্যবহার করতে হয়েছিলো একবার।
ম্যাক্স প্লাঙ্ক যখন কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সমস্যার সমাধান করছেন, তখনই আরেকটা সমস্যা এসে হাজির হয় পদার্থবিজ্ঞানের জগতে। সেটা হলো আলোক তড়িৎক্রিয়া।
ধাতব পাতের উপর আলো ফেললে সেই পাত থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। কিন্ত্ত কেন? এর ব্যাখ্যা কি?
নিউটনের গতিতত্ত্বের পক্ষে এর ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হলো না। ম্যাক্সওয়েলও তাঁর বিদ্যুতচুম্বকীয় তত্ত্বের মাধ্যমে এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না।
বিজ্ঞানীরা তখন উঠে পড়ে লাগলেন এর ব্যাখ্যা খুঁজতে। তখনও পর্যন্ত জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব বিজ্ঞানমহলে খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। এদিকে সমস্ত বিজ্ঞানী যখন এক উপায়ে আলোর তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যার চেষ্টা চালাচ্ছে তখন সুইজারল্যান্ড পেটেন্ট অফিসের কর্মী আরেক জার্মান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মাথায় ঘুরছে অন্যকিছু।
তিনি তখন ব্যস্ত থিওরি অফ জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে। একইসাথে তাঁর মাথা খাটাচ্ছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়েও। তিনিও তখন শুরু করেন আলোর তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যা খোঁজা। হঠাৎ আইনস্টাইনের মাথায় এল এক যুগান্তকরী খেয়াল। নিছক খেয়ালীমনেই বলে বসলেন: আলো শুধু শক্তি বা তরঙ্গ নয়, কণাও! বিজ্ঞানীদের মাথায় পড়লো বাজ। বিজ্ঞানমহলে সেকেলে নিউটনীয় আলোর কণা তত্ত্ব যেন বিজ্ঞান জগতে আবারো ফিরে এল!
তবে নিউটনের আলোর কণাতত্ত্বের সাথে আইনস্টাইনের তত্ত্বের কোনো মিল নেই। আলো (Light)-কে শক্তির (Power) প্যাকেট হিসেবে আখ্যায়িত করলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তবে তিনি আলোর তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য চিরায়ত কণাবিদ্যা বা বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তত্ত্বের দিকে হাত বাড়ালেন না। বরং বিকিরণের জন্য ম্যাক্স প্লাঙ্ক যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়েছিলেন তা দিয়েই ব্যাখ্যা করলেন আলোর তড়িৎক্রিয়া।
প্লাঙ্ক আলোর ক্ষুদ্র শক্তিগুচ্ছকে বলেছিলেন প্যাকেট বা কোয়ান্টাম (Quantum)। আইনস্টাইন আলোর সর্বনিম্ন শক্তির সেই প্যাকেটকেই বললেন “আলোর কণা” (Particle of Light)।
এভাবেই প্লাঙ্কীয় আলোর ক্ষুদ্র শক্তিগুচ্ছের প্যাকেট তত্ত্ব কোয়ান্টাম (Quantum) নামে এবং আইনস্টাইনের আলোর সর্বনিম্ন শক্তির প্যাকেটকে “আলোর কণা” (Particle of Light) নামে পদার্থবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আলোক তড়িৎক্রিয়া সংক্রান্ত সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে ।
প্রকৃতি
মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনাকালে একটি
শব্দ বার বার আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় সে শব্দটি হচ্ছে “প্রকৃতি” (NATURE-নেচার)।
কান টানলে যেমন মাথা আসে তেমনি সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনায় বার বার প্রকৃতি শব্দটি
স্বাভাবিকভাবে উঠে আছে। তাতে বুঝানো হয় যে, সৃষ্টির পেছনে যে সত্বা সরাসরি জড়িত
সেই সত্বাটির নাম “প্রকৃতি” (NATURE-নেচার)।
প্রতিটি আদি, আসল, খাঁটি বুঝাতে আমরা ব্যবহার করি প্রকৃত শব্দটি। যেমন চাঁদ একটি
প্রাকৃতিক সৃষ্টি, সূর্য, সাগর মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত, খাল বিল, নদী, বন মহাবন,
সুবিস্তৃত সবুজ শ্যামল সমতলভূমি সবই প্রাকৃতিক সৃষ্টি।
“বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, ম্যাক্স প্ল্যাংক, আলবার্ট
আইনস্টাইন , নিলস বোরের মতো পদার্থবিজ্ঞানী এবং আরো অনেকে এই
প্রকৃতির বিস্ময়কর প্রকৃতির জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন: কোয়ান্টাম
পদার্থবিজ্ঞান”
►“গত
শতাব্দীতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ এবং পদ্ধতিগুলি বিশুদ্ধ করা হয়েছে, যা
বিশ্বজুড়ে ইতিহাসের অন্য যেকোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের চেয়ে আরও স্পষ্টভাবে নিশ্চিত
করা হয়েছে”।
"কোপেনহেগেন
ব্যাখ্যা" কোনো জার্নালে প্রকাশ করা হয়নি। ১৯২৭ সালে যে
সলভে সম্মেলন বসে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, সেখানে তুলে ধরা হয় এই ব্যাখ্যাগুলো।
বিষয়ঃ আন্তঃবিজ্ঞান অন্তদ্বর্ন্দ্বের
স্বরূপ
১৯২৭ সাল থেকেই আইনস্টাইন কোয়ান্টাম
বলবিদ্যার বিরোধিতা শুরু করেন। বিশেষ করে অনিশ্চয়তা নীতি নিয়ে তাঁর প্রবল আপত্তি ছিল।
তখনকার তরুণ, প্রবীণ প্রায় সব
বিজ্ঞানীই কোয়ান্টামের প্রেমে মজেছেন, মেনে নিয়েছেন
অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। শুধু আইনস্টাইন বিষয়টা মানতে পারছেন না। অবশ্য একজনকে সঙ্গে
পেয়েছিলেন। আরউইন শ্রোডিঙ্গার। অথচ এখন দেখছেন, শ্রোডিঙ্গার
আর হাইজেনবার্গের তত্ত্ব মিলেমিশে অনিশ্চয়তা তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এর
শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। শ্রোডিঙ্গার-আইনস্টাইন, কেউই
হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা মানতে পারেননি। অন্যদিকে হাইজেনবার্গও মানতে
পারেননি শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ বলবিদ্যা। বিরোধ তুঙ্গে উঠল একসময়। আইনস্টাইনের
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ইলেকট্রন এক কক্ষপথ থেকে আরেক
কক্ষপথে লাফ দেয় কীভাবে? সে কথা তিনি ম্যাক্স বর্নের কাছে
জানতে চাইলেন। বর্ন যে জবাব দিয়েছিলেন, তাতে আইনস্টাইনের
মনে হয়েছিল, এই জবাব সত্যি হলে তাঁর ব্যাখ্যা করা ফটো
তড়িৎক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। ফোটনের আঘাতে কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে
যাওয়া ইলেকট্রন নাকি নিজেই ঠিক করবে, সে কোন দিকে যাবে!
আইনস্টাইনের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হলো। বললেন, বিজ্ঞান
এতটাই অনিশ্চিত হবে আগে জানলে বিজ্ঞানী হতাম না, হতাম
সরাইখানার বেয়ারা নয়তো ফুটপাতের মুচি।
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্রে কিছুটা
সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষ করে অনিশ্চয়তার উত্স
কোথায়, ইলেকট্রনের ধর্মে না
পরীক্ষাধীন যন্ত্রে?
আসলে দুই
দিকেই অনিশ্চয়তা আছে। সে বিষয়টা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য ১৯২৬ সালে বোর
সম্পূরক নীতির জন্ম দিলেন। আসলে বোর সম্পূরক নীতি প্রবর্তন করে হাইজেনবার্গের
অনিশ্চয়তা নীতিরই পূর্ণতা দিলেন। তিনি বললেন, ইলেকট্রনের একই মুহূর্তের
অবস্থান ও ভরবেগ মাপা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব একই
যন্ত্র দিয়ে দুটোকে মাপা। বোরের কথার অর্থ হলো, যে যন্ত্র
দিয়ে আপনি অবস্থান মাপতে পারবেন, সেই একই যন্ত্র দিয়ে
ইলেকট্রনের ভরবেগ পরিমাপ করতে পারবেন না। ভরবেগ মাপার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা
যন্ত্রের দরকার হবে। ভরবেগ মাপার যন্ত্রটি হবে অত্যন্ত হালকা। এই যন্ত্রের
সাহায্যে ভরবেগের ত্রুটি আপনি সর্বনিম্ন মানে নিয়ে আসতে পারবেন। আবার অবস্থান
নির্ণয়ের যন্ত্রটি হবে খুবই ভারী। সেটা ভরবেগের ত্রুটি অসীমে নিয়ে যাবে, কিন্তু অবস্থানের ত্রুটি সর্বনিম্ন মানে নামিয়ে আনবে।
পরমাণুতে ইলেকট্রন কোথায় থাকে? এটা বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট
উত্তর নেই। এ কথাই বলা হয়েছিল কোপেনগেহেন ব্যাখ্যায়। বলা হয়েছিল, যতক্ষণ ইলেকট্রনের অবস্থান মাপা না হচ্ছে, ততক্ষণ
এর নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান নেই। তরঙ্গ ফাংশনের যেসব জায়গায় এর থাকার সম্ভাবনা আছে,
তার প্রতিটি বিন্দুতেই ইলেকট্রন থাকবে। কিন্তু আমরা যখন কোনো
বিন্দুতে ইলেকট্রনকে দেখতে চাইব, তখনই সে জায়গায় তাকে
পাওয়া যাবে। অর্থাৎ সেই বিন্দুতে তরঙ্গ ফাংশন ভেঙে পড়বে বা কলাপ্স করবে। আর সেই
বিন্দুতে কণা হিসেবে আমরা দেখতে পাব ইলেকট্রনকে।
কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা
একটা সময় অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ ছিল আধুনিক বিজ্ঞান
বিশেষ করে তত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের সূতিকাগার। হঠাৎ করে বিগত বিংশ শতাব্দীর
বিশের দশকে কোপেনহেগেন হয়ে উঠেছিল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি। কিন্ত্ত কেন? কারণ, কিছু নয়। কণা কোয়ান্টামের অন্যতম নীতিনির্ধারক
বৈজ্ঞানিক নীলস বোর তখন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ঝাঁকে ঝাঁকে ইউরোপের
বিভিন্ন দেশ থেকে বিজ্ঞানপিপাসু তরুণ শিক্ষার্থীরা ভিড় জমিয়েছেন কোপেনহেগেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে, নীলস বোরের কাছ
থেকে পাঠ নিতে। সেই শিক্ষার্থীদের তালিকায় ছিলেন ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও।
হাইজেনবার্গ তখন নীলস বোরের বাড়ির ছাদের ওপরে চিলেকোঠার পাশে এক ঘরে বসবাস করতেন। হাইজেনবার্গ সবেমাত্র ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা প্রকাশ করেছেন। এতে বেরিয়ে আসছিল কোয়ান্টাম কণিকাদের, বিশেষ করে ইলেকট্রনের অদ্ভুত যতসব চরিত্র। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার খপ্পরে পড়ে ইলেকট্রনের মতো খুদে কণাদের প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য যে অদ্ভুত হয়ে উঠছে, তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হাইজেনবার্গ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, ভাবেন, অঙ্ক কষেন। নীলস বোর মাঝে মাঝে মাঝরাতে আবির্ভূত হন হাইজেনবার্গের ঘরে। গল্প করেন । গভীর রাত পর্যন্ত পরস্পরে খোশামোদে লিপ্ত হন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার চরিত্র বিশ্লেষণ নিয়ে। কোয়ান্টাম, অনিশ্চয়তাবাদ, অআপেক্ষিকতার নামে অদ্ভুত যতসব ব্যাপারস্যাপার বিজ্ঞানে আবির্ভূত হচ্ছিল। সে সবের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু হাইজেনবার্গ নয়, মাঝে মাঝে ম্যাক্স বর্ন আসেন, পাওলি আসেন, দ্য ব্রগলি আসেন। বোরের সঙ্গে আলোচনা করেন, নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তগুলোর একটা সন্মানজনক সুরাহা হওয়া দরকার বলে মনে করেন তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা। এ কারণেই লন্ডন, প্যারিস, জার্মানী ছেড়ে কোপেনহেগেনে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের ভীড়।
সম্পূরক
নীতি আর অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বোর আর হাইজেনবার্গ একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন ১৯২৬
সালের শেষ দিকে। অবশ্য তত দিনে শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশনও প্রকাশ হয়ে গেছে। তাই
সব মিলিয়ে কোয়ান্টাম কণাদের চরিত্রের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন বোর-হাইজেনবার্গ। সেটাই কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা নামে অমর হয়ে গেছে। কী
বলেছিলেন দুই বিজ্ঞানী কোপেনহেগেন ব্যাখ্যায়?
১. নীলস বোরের সম্পূরক নীতি, ২. হাইজেন বার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব, ৩. দ্য ব্রগলির দ্বৈত তত্ত্ব আর ৪. শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন মিলিয়ে কোয়ান্টাম কণাদের যত অদ্ভুত বিষয় আছে, সেগুলোর বর্ণনা আর ব্যাখ্যাই হলো কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা।
১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের
সলভেতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্মেলন। সেই সম্মেলনে
মুখোমুখি হলো দুই দল। সেখানেই বোর, তাঁর সম্পূরক নীতি ব্যাখ্যা করে আইনস্টাইনের যুক্তি খণ্ডণ করলেন।
আইনস্টাইন তাঁর বিপরীতে কোনো যুক্তি দিতে পারলেন না। তবু আইনস্টাইন মানতে পারেননি
অনিশ্চয়তা তত্ত্ব।
বোর যে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা দিলেন
শ্রোডিঙ্গার সেটা মেনে নিলেন। অন্য যেসব বিজ্ঞানীর অনিশ্চয়তা তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ
ছিল, তাঁরাও মেনে
নিয়েছিলেন কোপেনেহেগেন ব্যাখ্যা। মানতে পারেননি কেবল আইনস্টাইন। সেটা আমৃত্যু।
বোরের ব্যাখ্যা অসার প্রমাণের জন্য তিনি নানা রকম চেষ্টা-চরিত্র করেন। আসলে
আইনস্টাইন সুনির্দিষ্ট তত্ত্বে বিশ্বাসী। পদার্থবিজ্ঞানে অনিশ্চয়তা তত্ত্বের মতো
পরাবাস্তব একটা বিষয় এসে পড়বে, এটাই মানতে পারছিলেন না।
বোর তাঁকে বোঝাতে পারছিলেন না, সাধারণ চিরায়ত জগতের সঙ্গে
কোয়ান্টাম জগতের ফারাক যোজন যোজন। বাস্তব জগতে যেটা অসম্ভব মনে হয়, কোয়ান্টাম জগতে সেটাই সম্ভব।
১৯৩৫ সাল। আইনস্টাইন অনিশ্চয়তা তত্ত্বের ওপর আরেকবার আঘাত হানতে চাইলেন। প্রমাণ করতে চাইলেন, বোর তত্ত্ব ভুল। এ জন্য তিনি সামনে টেনে আনলেন আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসা তাঁর চিরায়ত সেই তত্ত্ব—“কোনো বস্তুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না”
বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব
বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব গড়েই উঠেছিল ওই
স্বীকার্যের ওপর ভিত্তি করে—মহাবিশ্বের
কোনো কিছুর বেগ আলোর চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাই আলোর বেগের চেয়ে বেশি গতিতে কোনো
তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব নয়। সুতরাং মহাকর্ষ বলকেও সেটা মানতে হবে। মহাকর্ষীয়
প্রভাব কখনোই আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ
আপেক্ষিকতা তত্ত্বে দেখালেন সেটাই। এটা করতে গিয়েই বেরিয়ে এল মহাকর্ষ তরঙ্গ নামে
সম্পূর্ণ অপরিচিত এক তরঙ্গ। মহাকর্ষ বলের সংবাদ বয়ে নিয়ে যায় এই তরঙ্গ, আলোর বেগের সমান গতিতে।
আইনস্টাইন দেখলেন, অনিশ্চয়তা তত্ত্বে এসে ধাক্কা খায় তাঁর এই
তত্ত্ব। কোয়ান্টাম কণাগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে মুহূর্তের
মধ্যেই। ব্যাপারটা ভাবায় আইনস্টাইনকে। (বিশেষ অআপেক্ষিকতা
খোদ সাধারণ অআপেক্ষিকতায় রয়েছে বিপরীত ব্যাখ্যা। বিশেষ অআপেক্ষিকতায় আলোর গতি
অনাপেক্ষিক অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট, কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতায় আলোর গতি আপেক্ষিক অর্থাৎ অনির্দিষ্ট)।
১৯৩৫ সাল নাগাদ কোয়ান্টাম মেকানিকস দাঁড়িয়ে
যায় শক্ত ভিতের ওপর। ঠিক সে সময় আঘাত হানলেন আইনস্টাইন। এ জন্য তিনি বোরিস
পোডলস্কি আর নাথান রোজেনকে সঙ্গে নিয়ে ইপিআর (EPR,
আইনস্টাইন, পেডোলস্কি আর রোজেনের নামের
আদ্যক্ষর সাজিয়ে এই নাম) নামে একটা বিভ্রমের (Paradox) জন্ম
দিলেন। সে ধাঁধা থেকেই জন্ম হলো কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট (Entangelment)
নামের এক নতুন তত্ত্বের।
রোজেন আর পোডলস্কিকে নিয়ে আইনস্টাইন ফিজিক্যাল
রিভিউতে লিখলেন চার পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ। তাতে একটা থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস
পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করালেন পাঠককে।
ধরা যাক, দুটো ইলেকট্রন ছুটছে পরস্পরের দিকে। দুটোর গতি আর ভরবেগ সমান। তারপর একসময় তাদের সংঘর্ষ হবে। পরস্পরকে তারা দেবে জোর
ধাক্কা। তারপর দুটো
ইলেকট্রন সমান গতিতে পরস্পর থেকে ছুটতে থাকবে বিপরীত দিকে। ধরা যাক, এভাবে ইলেকট্রন দুটি পরস্পর থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে চলে গেল। একজন
বৈজ্ঞানিক একটা ইলেকট্রন পরীক্ষা করলেন। নির্ণয় করলেন তার ভরবেগ আর গতিশক্তি।
সেই মুহূর্তে অন্য ইলেকট্রনের ভাগ্যে কী
ঘটছে? যখন বিজ্ঞানী ইলেকট্রনের গতিশক্তি বা অবস্থান বের করছেন, সেই মুহূর্তে তিনি অন্য ইলেকট্রনের গতিশক্তিও বের করে ফেলতে পারবেন। কারণ দুটোরই ভর, গতি সমান। তাই একটা দেখেই আরেকটার অবস্থান, ভরবেগ
বের করে ফেলা যায়।
ধরা যাক,
এভাবে ইলেকট্রন দুটি চলতে চলতে বহুদূরের পথ পাড়ি দিল। দুটির
মধ্যবর্তী দূরত্ব এখন ২৫ লাখ আলোকবর্ষ। একটার অবস্থান পৃথিবীতে হলে আরেকটা চলে
গেছে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে। আমরা পৃথিবীর ইলেকট্রনের ভরবেগ আর গতিশক্তি ও
অন্যান্য ধর্ম পরীক্ষা করে বলে দিতে পারি, অ্যান্ড্রোমিডাতে
চলে যাওয়া সেই ইলেকট্রনের এই মুহূর্তের ধর্মও। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসলে আইনস্টাইন কোয়ান্টাম
অনিশ্চয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। এখানেই আইনস্টাইনের প্রশ্ন। তাহলে কি কোয়ান্টাম
বলবিদ্যার এই আইনে আলোর গতির চেয়েও বেশি গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব।
কিছুতেই এটা হতে পারে না। এটাই তুলে ধরেছিলেন তিন বিজ্ঞানী। বলেছিলেন কোয়ান্টাম
তত্ত্ব তাহলে কি ভেঙে ফেলতে চায় বিশেষ আপেক্ষিকতার সেই বিখ্যাত নীতি। আলোর চেয়ে
বেশি গতি চলতে পারে না কোনো বস্তু, এমন কী তথ্যও?
সলভে সম্মেলনে বোর আর তার অনুসারীররা কোপেনহেগেন ব্যাখ্য দিয়ে বলেছিলেন, আসলেই কোয়ান্টাম কণিকারা তথ্য পাচার করতে পারে আলোর চেয়েও বেশি গতিতে। তা যতই অদ্ভুত শোনাক। অতি সম্প্রতি চিনের বিজ্ঞানীরা সত্যি সত্যিই কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট ঘটিয়ে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে তথ্য পাচার করতে সক্ষম হয়েছেন।
যতই অদ্ভুত শোনাক, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তায় ভরা
ব্যাপারগুলো পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বার বার।
সূত্র :
দ্য কোয়ান্টাম স্টোরি, জিম ব্যাগট
https://www.bigganchinta.com/space/বোর-আইনস্টাইন-বিতর্ক
পরিমাপের আগে
অস্তিত্বহীন?
►আলবার্ট
আইনস্টাইন বলতেন, ‘আমরা যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি না, তখন কি (আকাশে)
চাঁদ থাকে না?’ কথাটা চাঁদের জন্যে সত্য না হলেও
অতিপারমাণবিক জগতে কিন্তু সত্য। অতিপারমাণবিক তত্ত্বে পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত
কণার অস্তিত্ব থাকে না।
২০১৫ সালে এক পরীক্ষায় অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ
অ্যান্ড্রু ট্রাসকট প্রমাণ দেন যে, ‘পরিমাপই সবকিছু । না তাকানো পর্যন্ত কোয়ান্টাম স্তরে বাস্তবতা বলতে কিছুই নেই।’
তাঁর দল পরীক্ষাটি চালান হিলিয়াম পরমাণু দিয়ে।
সূত্র: অ্যা ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম/স্টিফেন হকিং, এফন্যাল ডট জিওভি, ইউঅরিজন ডট
এজু, ডিসকভার ম্যাগাজিন, নিউ
অ্যাটলাস ডট কম, উইকিপিডিয়া।
http://newton.ex.ac.uk/research/qsystems/people/jenkins/mbody/mbody2.html
এক নজরে কোয়ান্টামের প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য
►কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে বিশাল কোনো বস্তু যেমন
তারা ও ছায়াপথ এবং মহাবিস্ফোরণ
সংক্রান্ত বিশ্বতত্ত্বমূলক ঘটনার সুক্ষ্ণতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
করা যায়।
►পদার্থবিজ্ঞানের সুক্ষ্ণতাত্ত্বিক যেসব ক্ষেত্রে চিরায়ত
নিউটনীয় বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, সেসব ক্ষেত্রে পদার্থগুলির ভৌত আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাবার জন্য
পদার্থবিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ব্যবহার করে থাকেন।
►পারমাণবিক অথবা তার চেয়েও ছোট মাপের কোনো ভৌত ব্যবস্থায়, খুব নিম্ন অথবা খুব উচ্চ শক্তিতে, অথবা অতিশীতল তাপমাত্রায় চিরায়ত এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের
বিশ্লেষণের মধ্যে প্রায়শই পার্থক্য দেখা যায়।
►কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান রসায়ন, আণবিক জীববিজ্ঞান, ইলেক্ট্রনিক্স, কণা পদার্থবিজ্ঞান, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং
প্রযুক্তিবিদ্যার আধুনিক উন্নয়নের ভিত্তি, এবং বিজ্ঞানের
এই শাখাগুলো বিগত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীকে
প্রায় সম্পূর্ণভাবে রূপান্তরিত করেছে।
Comments
Post a Comment