কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ফর্মুলা

 কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ফর্মুলা

আদর্শ কৃষ্ণবস্তু এবং তার বিকিরণসহ প্রথম সসূত্র ধারণা দেন জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী গুস্তভ কার্শফ ১৮৬০ সালে। গুস্তভ কার্শভ বলেন, কোনো বস্তুর তাপমাত্রা যদি পরিবেশের তাপমাত্রার চেয়ে কম হয়, সেই বস্তু নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘের বিকিরণ শোষণ করে নিজের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করবে। আবার কোনো বস্তুর তাপমাত্রা যদি পরিবেশের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হয় তবে সেই বস্তু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘের আলো বিকিরণ করে তরঙ্গদৈর্ঘ হ্রাস করবে। ১৮৯৫ সাল নাগাদ কৃষ্ণ বস্তু তৈরি হয়। এরমধ্যে ফেরি আর ভিয়েনের কৃষ্ণবস্তু বেশি পরিচিত। কৃষ্ণবস্তুর দেওয়ালে হার্জিয়ান কম্পকদের এক রকম শক্তি -বণ্টন ব্যবস্থা ও এক ধরণের এন্ট্রপি বণ্টন-ব্যবস্থা আছে। সাম্য অবস্থায় এন্ট্রপি সব চেয়ে বেশি হতে হবে এবং তা পরিসংখ্যান পদ্ধতির সাহায্যে বোলৎজমানের মৌলিক সমীকরণটি কাজে লাগিয়ে গণনা করা যায় সম্ভাব্যতা গণনা করতে গিয়ে প্লাঙ্ক দেখলেন কম্পকের শক্তিকে ছোট অথচ সসীম অংশে – ‘কোয়ান্টা’-য় ভাগ করে ফেলা সুবিধাজনক। এই অনুমানের সাহায্যে প্লাঙ্ক একটি কম্পকের গড় শক্তি পরিমাপ করতে পারলেন। এর থেকেই এলো কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ ফর্মুলা সূত্র : বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যা ও ব্যক্তিত্ব : ডঃ শঙ্কর সেনগুপ্ত

ফেরির কৃষ্ণবস্তুটা দুই দেয়ালের ধাতব গোলক দিয়ে তৈরি। গোলকটির দুই দেয়ালের মধ্যে বায়ুশূন্য ফাঁপা। কেন্দ্রভাগও ফাঁপা। বাইরের দেয়ালের বাইরের পৃষ্ঠ নিকেল দিয়ে পালিশ করা। ভেতরের দেয়ালের ভেতরের পৃষ্ঠে থাকে ভুষা বালির প্রলেপ। গোলকের একদিকে ছোট্ট একটা ছিদ্র থাকে। ছিদ্রের ঠিক উল্টো দিকে দেয়ালে আছে পিরামিডের মতো একটা তল।

ছিদ্র দিয়ে ঢোকা বিকির্ণ তাপ শক্তি সেই পিরামিড তলে গিয়ে পড়ে। পিরামিড তলের কারণে আলো আর সোজা বিপরীত পথে ফিরে আসতে পারে না। বিকির্ণ তাপশক্তি সেই তলে প্রতিফলিত ও শোষিত হয়। প্রতিফলিত রশ্মি গিয়ে আবার দেয়ালের আরেক স্থানে পড়ে। সেখানেও বিকির্ণ তাপশক্তি শোষিত ও প্রতিফলিত হয়। সেখান প্রতিফলিত রশ্মি আবার দেয়ালের আরেক জায়গায় পড়ে। এভাবে বার বার প্রতিফলিত হবার ফলে সকল স্থানে কিছু না কিছু শক্তি শোষিত হয়। বিকিরণের শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় পুরো বিকির্ণ শক্তিই দেওয়ালের বিভিন্ন স্থানে শোষিত হয়ে পুরোপুরি শক্তি হারিয়ে ফেলে অর্থাৎ সবটুকু শক্তি শোষণ করে নেয় সেই কৃষ্ণবস্তু।

তখনাকার বিজ্ঞানীরা জানতেন, কোনো বস্তুকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করতে থাকলে তার বিকিরণের পরিমাণটাও বাড়তে থাকে। সাথে সাথে বিকিরণের রংয়েরও পরিবর্তন ঘটে। একটা লোহাকে উত্তপ্ত করলে বিকিরণের ব্যপারটা স্বচক্ষে দেখা সম্ভব।

লোহাকে উতপ্ত করলে প্রথমে লোহা শুধু গরমই হবে। রংয়ের কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু আরও উতপ্ত করলে তখন হালকা লাল রংয়ের আভা দেখা দেবেতার মানে বিকিরণের রং পরিবর্তনের বিষয়টা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এখন যদি তাপমমাত্রা আরও বৃদ্ধি করা যায়? লোহার রং তখন গাঢ় লাল হয়ে উঠবেতাপমাত্রা ৫০০ ডিগ্রির ওপরে উঠলেই কেবল লোহার রং লাল হবে। তাপাত্রা ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে গরম লোহা তখন ছড়াবে উজ্বল হলুদ দ্যূতি। তার মানে বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমছে। কারণ লালের চেয়ে হলুদ রংয়ের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। লাল থেকে কিন্তু সরাসরি লোহার রং একবারেই হলুদ হয় না। ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পরে তাপমাত্রা ধীরে বাড়াতে একসময় কমলা রং দেখা যাবে।

৮০০ ডিগ্রি থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকলে নিউটনের বর্ণালী বেনিআসহকলার বাকি রংগুলোও একে একে দেখা যাবে। সবুজ, আসমানী, নীল আর বেগুনিতারপর লোহার তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একসময় হবে সূর্য পৃষ্ঠের সমান। তখন সেই উতপ্ত লোহার রং উজ্জ্বল সাদা দেখাবে।

কোনো বস্তুর তাপমাত্রা কতটা বাড়ালে কতটুকু তাপ কিংবা আলোকরশ্মি বিকিরণ করবে সেটা তুলনা করার জন্য একটা আদর্শ কৃষ্ণবস্তুর দরকার হয়ে পড়ে।

আদর্শ কৃষ্ণবস্তু তৈরি হলো। বিজ্ঞানীরা সেটা নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। লোহার টুকরোর মতো কৃষ্ণবস্তুকেও উতপ্ত করা হলো। ধরা যাক, ৭০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কৃষ্ণবস্তুকে উৎপত্ত করা হয়েছে। ওই তাপমাত্রায় কৃষ্ণবস্তুটি যে তাপমাত্রা ও আলোকরশ্মি বিকিরণ করবে তা অন্য যেকোনো বস্তুর চেয়ে বেশি। কারণ কোনো বস্তুই কৃষ্ণবস্তুর মতো শতভাভাগ তাপমাত্রা শোষণ করতে পারে না। তাই কোনো বস্তুর বিকির্ণ তাপ ও আলো কৃষ্ণবস্তুর সমান হবে না।

কৃষ্ণবস্তু তো পাওয়া গেল, এবার এর বিকিরণের জন্য একটা সমীকরণ দরকার। বিকিরণ সম্পর্কিত প্রথম সমীকরণটা দাঁড় করালেন দুই অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী জোসেফ স্টিফেন ও লুডভিগ বোলৎজম্যান। সেটা হলো,

এই সূত্রের সার কথা হলো কৃষ্ণবস্তু থেকে তাপ ও আলোর আকারে বিকির্ণ মোট শক্তি E-এর পরিমাণ বস্তুর পরম তাপমাত্রা T-এর সমানুপাতিক। সমীকরণে একটা ধ্রুবক K ব্যবহার করা হয়েছে, এটা বোলৎজম্যান ধ্রুবক।

অবশেষে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ঞ গহব্বরের সন্ধান পাওয়া গেল!

মহাকর্ষের মাধ্যমে আলোর বেঁকে যাওয়ার কারণে মহাকাশে যে অভাবনীয় ঘটনা পরিদৃষ্ট হয় তাকে মহাকর্ষীয় লেন্সিং বলা হয় যা জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বের সাথে পঠিত হয় উল্লেখ্য,, লিগো এবং জিও ৬০০ প্রকল্পের অনেক বিজ্ঞানীই আলবার্ট আইনস্টাইন নব উদ্ভাবিত সাধারণ আপেক্ষিকতায় কৃষ্ণ বিবর (Black Hole) থেকে নির্গত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অধ্যয়নের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আদি মহাবিশ্বের গঠন বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারেন। তাছাড়া, মহাকর্ষের প্রভাবে আলো বাঁকিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া, সম ধীরকরণ এবং ব্ল্যাকহোলের (কৃষ্ঞ গহব্বর) ঘটনা দিগন্ত সহ মহাজাগতিক অনেক বিষয়ে সম্ভাবনাসূচক ইংগিত করতে সক্ষম হয়েছিল যার সত্যতা  অতি সম্প্রতি আবারও  প্রমাণিত হয়েছে প্রথমবারের মত কৃষ্ঞ গহব্বরের ছবি তোলার মধ্য দিয়ে

১০ই এপ্রিল, ২০১৯-এই দিনটি ছিল বর্তমান চলমান সহস্রাব্দের একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের তৃতীয় সেরা মহাজাগতিক সেরা বৈজ্ঞানিক আবিস্কার। এ দিনটিতে Event Horizon Telescope প্রকল্পের অধীনে দূর আকাশে উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক হিসাবে উদ্ভাসিত স্যাজিট্যারিয়াস--কে বহুল আলোচিত ও প্রত্যাশিত কৃষ্ঞ গহব্বর হিসাবে একদল জ্যোতির্বিদরা সরাসরি প্রথমবারের স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন- যে কৃষ্ঞ গহব্বর দেখার সোনালী স্বপ্নে শোয়ার্জশিল্ড, ওপেনহাইনার, জন হুটলার, রজার পেনরোজ, জেলদোভচের মত তখনকার প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর বিভোর ছিলেন; তা সত্য স্বপ্নে পরিণত হলো ১০ ই এপ্রিল।

উল্লেখ্য, চলতি শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে প্রথম আবিস্কারটি হচ্ছে: ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'নিউট্রিনোর' উচ্চগতি সংক্রান্ত, দ্বিতীয় আবিস্কার: ৪ঠা জুলাই, ২০১২ সালে 'হিগস বোসন কণা' এবং সর্বশেষ যুগান্তকরী তৃতীয় আবিস্কারটি হচ্ছে: আলোচ্য কৃষ্ঞ গহব্বর (Dark Energy/Dark Matter) বা 'ব্ল্যাক হোল'(গুপ্তবস্ত্ত) সংক্রান্ত।

উল্লেখ্য, কৃষ্ঞ গহব্বর বলতে মহাকাশে আদৌ কিছু নেই-এই চ্যালেন্জ্ঞ করেছিলেন স্টিফেন হকিং-থার্ন নামক দুইজন বিজ্ঞানী।

যাহোকা, কৃষ্ঞ গহব্বর (Dark Energy/Dark Matter) বা 'ব্ল্যাক হোল'(গুপ্তবস্ত্ত) এর অস্তিত্ব নিছক স্বপ্ন না বাস্তব তা সরেজমিনে চাক্ষুস দেখার উদ্দেশ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা "Event Horazine Telescope" নামক এক যুগান্তকরী মহাজাগতিক প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষ্ঞগহব্বরের ঘটনা দিগন্তের (Event Horazine) ছায়াকে চিত্রিত করার জন্য ইন্টারফেরোমেট্রি পদ্ধতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বেতার দূরবীনগুলোকে একত্র করে একটি বড় ব্যাসের দূরবীন তৈরি করেন-যার ব্যাস হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার। কৃষ্ঞ গহব্বরের ঘটনা দিগন্তের বাইরের অ্যাক্রেশন ডিস্ক থেকে যে আলো পৃথিবীতে আসে, তাতে দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ থাকে না। কিন্ত্ত সেখান থেকে যে বেতার তরঙ্গ আসে, সেগুলো শনাক্ত করার জন্য দরকার পৃথিবীর আকার সমান টেলিস্কোপের- যা আদৌ সম্ভবপর নয় বিধায় বিকল্প হিসাবে বেতার দূরবীনগুলোকে এই একত্রকরণ। দূরবীনের বিশ্লিষ্টকরণ (রিসলিউশন) ক্ষমতা হচ্ছে প্রায় ২০ মাইক্রো আর্কসেকেন্ড যা হলো পূর্ণ চক্রের ৯ কোটি ভাগের এক ভাগ। উক্ত Event Horizon Telescope এর মাধ্যমে সম্প্রতি বেতার জ্যোতির্বিদরা ১ দশমিক ৩ মিলিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের একটি বিশাল উপবৃত্তাকার M87 নামক গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দানবীয় কৃষ্ঞবিবরের ছায়ার (প্রতিলিপির) চারিদিকে যে পরিবৃদ্ধি চক্র (অ্যাক্রেশন ডিস্ক) এবং জেট আছে তা ভেদ করে  ঘটনা দিগন্তের বাইরের ছবি তুলতে সক্ষম হন  ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এতে জানা যায় যে, ছায়ার চারিদিকের ফোটন চক্রের ব্যাসার্ধ হলো মাত্র ১৫০ জ্যোতির্বিদ্যা একক (AU) যা আমাদের সৌরজগতের চেয়ে একটু বড়।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, Event Horizon Telescope এর ছবিটির মধ্যের কালো অংশটি, যাকে কৃষ্ঞগহব্বরের ছায়া বলা হয় সেটির ব্যাসার্ধ ঘটনা দিগন্তের প্রায় আড়াই গুণ। ওই ব্যাসার্ধের মধ্যে কৃষ্ঞগহব্বের কাছে কোনো ফোটন এলে হয় সেটি কৃষ্ঞগহব্বরে পতিত হবে অথবা কৃষ্ঞগহব্বরের চারিদিকে ঘটনা দিগন্তের বাইরে ফোটন গোলক নামে একটি জায়গায় আবদ্ধ হবে। কাজেই সেটুকু জায়গা জুড়ে কৃষ্ঞগহব্বরের ছায়া তৈরি হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন তাঁর লেখা একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে যু্ক্তি দেখালেন, একটি তারা (বা কণাসমষ্টি) কখনোই সোয়ার্জশিল্ড সিঙ্গুলারিটিতে পরিণত হতে পারে না। কারণ তার আগেই ঘূর্ণনের মাত্রা এত বেশি হবে যে বাইরের দিকের কণাগুলো আলোর গতিবেগে ভ্রমণ করবে (যা সম্ভব নয়) এবং পুরো সিস্টেমটা অস্থিত হয়ে পড়বে অর্থাৎ ভেঙ্গে পড়বে।ততদিনে অনেক জ্ঞানী, গুণী নক্ষত্রের অন্তর্মুখী পতন গবেষণা করে বুঝতে পেরেছিলেন যে, সিস্টেমটা অস্থিত হোক বা ন হোক, সেটি তারাটির পতন রোধ করতে পারবে না। এর ৯ বছর আগে ১৯৩০ সালে ১৯ বছর বয়সী ভারতীয় সুব্রহ্মণ্যন  চন্দ্রশেখর সমু্দ্রপথে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাচ্ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার্থে। জাহাজে বসেই তিনি গণনা করলেন যে, একটি শ্বেত বামনের ভর যদি সূর্যের ভরের চেয়ে ১দশমিক ৪ গুণ বেশি হয়, তবে সেটি অস্থিত হয়ে পড়বে অর্থাৎ সেটির অন্ত:পতন রোধ করা যাবে না কিন্তু সূর্যের মতো নক্ষত্র তার সব জ্বালানি ফুরিয়ে ফেললে যদি শ্বেত বামনে পরিণত হয়, সেই শ্বেত বামনের আরও আন্তঃপতন কে রোধ করে? দেখা গেল  তৎসময়ে সদ্য আবিস্কৃত কোয়ান্টাম ঘটনা (পাউলির অপবর্জননীতি)-যা বলে: দুটি ইলেকট্রন একই কোয়ান্টাম দশায় থাকতে পারবে না, সেটি শ্বেত বামনের গঠনকে রক্ষা করবে। ইলেকট্রনদের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেলে তারা এক ধরণের বিতাড়ক চাপ সৃষ্টি করবে, যাকে ইলেকট্রন অপজাত চাপ (Degeneracy Pressure) বলে যা তারার আন্তঃপতন রোধ করবে। কিন্ত্ত প্রশ্ন দেখা দেয় সূর্য থেকে অনেক বেশি ভরের তারাদের কী হবে? ১৯৩৪ সালে চন্দ্রশেখর কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও অপেক্ষিকতা সূত্র এক করে দেখালেন যে, তারার আন্তঃপতন রোধ করার কোন উপায় নেই। চন্দ্রশেখরের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন এটা মানলেন না, প্রকাশ্যে বিজ্ঞানসভায় চন্দ্রশেখরের বক্তব্যকে সরাসরি চ্যালেন্জ্ঞ করে বললেন, গণনায় ভুল আছে। এডিংটন ভেবেছিলেন প্রকৃতির মধ্যে নিশ্চয় এমন কোনো উপায় আছে যার ফলে নক্ষত্রের চূড়ান্ত পতন রোধ করা যাবে। আর্থার এডিংটনের মত প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর এই প্রতিরোধ শুধু চন্দ্রশেখরের গবেষণারই ক্ষতি করেনি, বরং কৃষ্ঞগহব্বর সংক্রান্ত বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় বিলম্ব ঘটিয়েছেন এমনকি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের বিজয় ঝান্ডা উড্ডীয়নকেও অনেকটা ম্লান করছিল সেদিনের এই আপত্তিটি অথচ সে সময় সবচেয়ে আর্থার এডিংটনই নাকি ভালভাবে বুঝেছিলেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে। অবশ্য পরবর্তিতে অর্থাৎ ১৯১৯ সালে এডিংটন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে সূর্যের চারিদিকের স্থান-কালের বক্রতা প্রমাণ করতে দক্ষিণ আমেরিকায় সূর্য গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করে যে, সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র আলোর পথ আইনস্টাইনের সূত্র অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। (বিজ্ঞান চিন্তা পৃঃ ২৯)। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতার গণিত ব্যাখ্যা করে তিনি বেশ কয়েকটি বই ও প্রবন্ধ লেখেন। এমনকি একটি বইয়ে খেলাচ্ছলে এমন একটি ঘন নক্ষত্রের আলোচনা  করেন, যার মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র আলোক কণিকাকে ধরে রাখবে

জ্ঞাতব্য যে, চন্দ্রশেখর যখন শ্বেত বামনের উপর কাজ করেছিলেন তখন ক্যালিফোনিয়ায় গবেষণা করতেন সুইস জ্যোতির্বিদ ফ্রিৎজ জুইকি। জুইকি সুপারনোভা হতে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে আছড়ে পড়া এমন এক উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খগোল কণা (কসমিক রে) চিহ্নিত করলেন-যা নক্ষত্রের অন্তিম বিস্ফোরণের উৎস। সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরে সেটি একটি উচ্চ ঘনত্বের  নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হতে পারে বলে বেশ কয়েকটি ছোট প্রবন্ধও জুইকি লিখেছিলেন।

উল্লেখ্য, নিউট্রন নামে যে একটি কণা আছে তা তখন সবেমাত্র আবিস্কার হয়েছিলএখন আমরা জানতে পারছি যে, সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফল তারার মধ্যে অতি উচ্চ চাপে পরমাণুর প্রোটন ও ইলেকট্রন মিথস্ত্রিয়া করে নিউট্রন ও নিউট্রিনো কণায় পরিণত হয়। খুবই অল্প ভরের নিউট্রিনো সহজেই তারাটি থেকে বিকিরিত হয়ে যায়। কিন্তু উইকি তাত্ত্বিক ছিলেন না, তাই তিনি তার ধারণাকে তত্ত্বের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে পারলেন না, সে জন্য তার এই ধারণা তখন  পুরোপুরি সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। তবে, তৎকালীন বিজ্ঞানীরা জুইকির সুপারনোভা ধারণাটি গ্রহণ করলেন নিউট্রনো তারাকে বললেন নিতান্তই কল্পনা (বিচি ২৯)

এদিকে ওপেনহাইমার তার ছাত্র হার্টল্যান্ড স্নাইডারের সঙ্গে সোয়ার্জশিল্ড মেট্রিক নিয়ে কাজ করে দেখান যে, একটি তারার অন্তর্মুখি পতন যখন রোধ করা যাবে না, তখন বাইরে থেকে একজন দর্শক তারাটির পৃষ্ঠদেশ ধীরে ধীরে ছোট হতে দেখবে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর দর্শক  সেই অন্তঃপতন আর দেখতে পাবে না । কারণ, মহাকর্ষের প্রভাব আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে প্রায় অসীম করে তুলবে। ফলে তা আমরা নিরীক্ষণ করতে পারব না। কিন্ত্ত ওপেনহাইমার এই চিন্তাটাকে আর প্রসারিত করলেন না, যদিও কাজটির মধ্যে কৃষ্ঞগহব্বরের সব ধারণাই বর্তমান ছিল।   

অতঃপর মার্কিন বিজ্ঞানী জন হুইলার সহকর্মী কেন্ট হ্যারিসন ও মাসামি ওয়াকনের সাথে সমন্বিতভাবে তারাদের অতি ঘন অবস্থা গণনা করে দেখলেন যে, দুই সৌরভরের বেশি তারার চূড়ান্ত অন্তঃপতন নিউট্রন চাপ দিয়ে আটকানো যাবে না। তাই হুইলার তখন এডিংটনের মতোই ভাবলেন, অন্য কোন একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, হয় বিকিরণ বা ঘূর্ণন অথবা বিস্ফোরণ-এই ধরণের অদ্ভূত পরিণতি থেকে তারাটিকে বাঁচাবে। (বিচি ২৮-২৯)                                                              ১৯৬৭ সালে জন হুইলার নক্ষত্রের এহেন অন্তঃপতনের অবস্থার প্রথমবারের মত নামকরণ করেছিলেন ব্ল্যাক হোল। ততদিনে কয়েকজন সোভিয়েত পদার্থ বিজ্ঞানী যথাক্রমে ইয়াকভ জেলদোভিচ, ভিতালি গিনজবুর্গ এবং হগর নভিকভ কৃষ্ঞগহব্বরের রীতিমত গবেষকরূপ আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারা সকলেই ব্ল্যাকহোল বিষয়ে এডিংটন, আইনস্টাইন কিংবা  হুইলারের সাথে একমত পোষন করতেন।

সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রয়োগ কৃষ্ঞগহব্বরের ভেতরে স্থান-কালের চরম বক্রতার অসীম ঘনত্বের (সিঙ্গুলারিটি)সত্যতা প্রমাণ

ইংরেজ বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ কৃষ্ঞগহব্বরের ভেতরে স্থান-কালের চরম বক্রতার অসীম ঘনত্ব (সিঙ্গুলারিটি) সৃষ্টি হবে সেটা প্রমাণ করলেন। এই সব ক'টি আবিস্কারেই সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রয়োগ আছে, এর সঙ্গে জ্যোতিপদার্থবিদ্যা তখন একটা নতুন জগতে প্রবেশ করল। এই নতুন সময়ে অর্থাৎ ১৯৬০ এর দশকে স্টিফেন হকিং তাঁর পিএইচডি থিসিস রচনা করেছিলেন। উক্ত থিসিসে তিনি মহাবিশ্বের উষালগ্নে সমসত্ত্ব বস্ত্ত-ঘনত্ব থেকে পৃথক পৃথক গ্যালাক্সি সৃষ্টির সমস্যা নিয়ে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গপ্রবাহ, মহাবিশ্বের অআদি ও অন্তের সিঙ্গুলারিটির সম্ভাবনা নিয়ে অআলোকপাত করেন (বিচি পৃঃ ২৯)। ওই সময় থেকেই পেনরোজারের সঙ্গে হকিংয়ের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা শুরু হয়। এই দুজনে মিলে পরবর্তী ১০ বছরে কৃষ্ঞ গহব্বর সম্বন্ধীয় বিজ্ঞানকে দৃড় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন (বিচি ২৯)তাছাড়া জেমস বার্ডিন ও ব্রান্ডন কার্টারের সঙ্গে যৌথ কাজে প্রতিষ্ঠা করেন তাপ গতিবিদ্যার নীতির সাথে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ কৃষ্ঞগহব্বর বলবিদ্যার  নীতি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বরিশালে বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমল কুমার রায় চৌধুরী। রায় চৌধুরীর লদ্ধ সমীকরণে মুক্ত বস্ত্তকণার পথকে বক্র স্থান-কালরূপে বর্ণনা করা হয়েছে যা পুরোপুরি জ্যামিতিক, আইনস্টাইনের সমীকরণের প্রভাব মুক্ত। বরং উভয় (রায় চৌধুরী বনাম আইনস্টাইনীয়) সমীকরণ ব্যবহারে পাওয়া যায় শক্তি ও ভরবেগ কিভাবে বস্ত্তর গতিপথ নির্ধারণ করে সে সম্পর্কে তাত্ত্বিক সূত্র। স্টিফেন হকিং রায় চৌধুরীর লদ্ধ সমীকরণ ব্যবহার করে দেখালেন যে, মহাবিশ্বের শুরুতে অতি ঘন অবস্থায় সিঙ্গুলারিটি বিরাজমান ছিল। সিঙ্গুলারিটি তখনই হবে, যখন রায় চৌধুরী সমীকরণ অনুযায়ী বস্ত্তকণার (বা আলোর) পথসমূহ বক্রস্থানে এক জায়গায় মিলিত হবে (বিচি পৃ ২৯)

রেলে-জিনসের সূত্রকম্পাঙ্ক বাড়তে বাড়তে অসীমে চলে যায়

রেলে-জিনসের সূত্রে বলা হয়েছে. তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে কৃষ্ণবস্তুর সর্বোচ্চ বিকিরণের তীব্রতা বাড়ে। ভীনের ভাষায় তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে সর্বোচ্চ বিকিরণের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমতে থাকে অর্থাৎ বিকিরণের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। কম্পাঙ্ক বাড়তে বাড়তে অসীমে চলে যায়।

কৃষ্ণগহ্বরের সীমানায় গেলে সময় থেমে যায়

কৃষ্ণগহ্বর সম্বন্ধে একটা সাধারণ ভুল ধারণা হলো এরা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মত সব শুষে নেয়কিন্তু সেটা সত্য নয়আসল ব্যাপারটা হলো ব্ল্যাক-হোলদের ঘনত্ব এত বেশি থাকে যে এদের কেন্দ্রের অভিকর্ষ বল হয় অসীম। এটাকে বলা হয় gravitational singularity. এটাই এর আশেপাশের গ্রহাণু হতে শুরু করে আলো পর্যন্ত সব কিছুকে নিজের ভেতরে টেনে নেয়। তবে কথা হলো- একটা নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে থেকে। আমরা একটু আগেই দেখিয়েছি, অভিকর্ষ এবং সময়ের সম্পর্কটা একটু দা-কুমড়ো টাইপের। সময় চায় ছুটে চলতে, কিন্তু অভিকর্ষ চায় সময়কে বশে রাখতে। সুতরাং, কী ঘটবে যদি সময় এমন একটা অভিকর্ষ বল দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায় যেটা থেকে আলোও নিস্তার পায় না?

সময় থেমে যাবে। প্রত্যেকটা ব্ল্যাক-হোলকে ঘিরে বাইরের দিকে চক্রাকারে একটা এলাকা আছে। এটাকে বলে ঘটনা দিগন্ত (event horizon)’এই ইভেন্ট হরাইজন হচ্ছে পয়েন্ট অব নো রিটার্নঅর্থাৎ এই ইভেন্ট হরাইজন রেখা অতিক্রম করে গেলে ব্ল্যাক-হোলের হাত থেকে আপনাকে বাঁচানোর সাধ্য আর কারো নেই।

 

Comments

Popular posts from this blog

ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথ্য ব্যাংক (বাংলাদেশ)

Science-Tech News

আধুনিক বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে মহাবিশ্বের জন্মোতিহাস