হাইজেনবার্গের রহস্যময় অনিশ্চয়তা নীতি!
হাইজেনবার্গের রহস্যময় অনিশ্চয়তা নীতি!
বিশেষ
করে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে হাইজেনবার্গের আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তা
নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমাদের বাহ্যিক জগত সম্পর্কে ধারনা কিছুটা বদলে দেয়
এবং যা আমাদের মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়, যার কিছু উত্তর আমাদের জানা আর কিছু
অজানা।
তাহলে হাইজেনবার্গের সূত্রটিকে
গানিতিকভাবে লেখা যায়,
Δ X Δ P
≥ h cut/2
যেখানে,
Δ X= অবস্থানের অনিশ্চয়তা বা পরিবর্তন
Δ P= ভরবেগের অনিশ্চয়তা বা পরিবর্তন
এখানে, h cut এর মান হল h/2 π. আমরা জানি h হল প্লাঙ্কের ধ্রুবক
যার মান ৬.৬২৬ x ১০^-৩৪ জুল পার সেকেন্ড। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর
ক্ষেত্রে এই ধ্রুবকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক জায়গায় এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থাৎ
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি থেকে আমরা জানতে পারি যে, একটি কণার অবস্থানের পরিবর্তন এবং এর ভরবেগের পরিবর্তনের গুনফলের
সর্বনিম্ন মান হবে h cut/ 2 অর্থাৎ তা কখনোই শূন্য হবে
না।
হাইজেনবার্গের এই অনিশ্চয়তা নীতি থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে, অনেক বেশী ভরবেগ সম্পন্ন কণার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যেমন কঠিন ঠিক
তেমনি একটি কণার অবস্থান যত নির্দিষ্ট করে আমরা নির্ণয় করার চেষ্টা করবো তার ভরবেগ
নির্ণয় করা তত বেশী কঠিন হতে থাকবে। অর্থাৎ একটি কণার একটি নির্দিষ্ট সময়ে এর সঠিক
অবস্থান এবং সঠিক ভরবেগ নির্ণয় করা শুধু কঠিনই নয় বরং অসম্ভব!
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির প্রমান পাওয়া যায়, একটি লেজার রশ্মির পরীক্ষায়। একটি পরীক্ষাগারে যদি. একটি লেজার রশ্মিকে
আমরা একটি এক ছিদ্রবিশিষ্ট স্লিটের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করাই যা অপরপাশে রাখা পর্দায়
একটি দাগ বা বিন্দু তৈরি করে। বিন্দুটির দৈর্ঘ্যও ছোট হতে থাকবে। স্লিটটির ছিদ্রের
দৈর্ঘ্য কমাতে কমাতে এমন একটা পর্যায় আসবে যখন থেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কাজ করা
শুরু করবে বা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি কাজ করা শুরু করবে। ছিদ্রের দৈর্ঘ্য
আরও কমাতে থাকলে একসময় দেখা যাবে বিন্দুটি ছোট হতে হতে আবার দুই পাশে প্রশস্ত হয়ে
দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিন্দুটির তো আরও ক্ষুদ্র
হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু তা না হয়ে বিন্দুটি প্রশস্ত হয়েছে!
এর ব্যাখ্যা দেয়া যায় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি থেকে। যখন স্লিটের
ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আমরা কমাতে থাকবো তার মানে হবে সুত্রের ΔX এর মান আমরা কমাচ্ছি অর্থাৎ কণার অবস্থান আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা
করছি। কিন্তু ছিদ্রের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে একটি সীমায় গিয়ে দেখা যাবে, যদি আমরা ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আরও কমাই তাহলে ব্যাপারটি এমন দাঁড়াবে যে
আমরা অনিশ্চয়তা নীতির Δ X Δ P ≥ h
cut/2 সম্পর্কটি ভাঙতে
যাচ্ছি। অনিশ্চয়তা নীতি বজায় রাখতে এখন যেটি দরকার তা হলো Δ P এর অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়া। ঠিক সে কারনেই আমরা দেখতে পাই যে, X ডাইরেকশনে অনুভুমিক দিকে ভরবেগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই স্লিটের
ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আরও কমাতে থাকলে অপরপাশে আপতিত ফোটনের ভরবেগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি
পেয়ে আরও প্রশস্ত রেখা তৈরি করে। ছিদ্রের দৈর্ঘ্য যত কমানো হবে আপতিত রেখা তত বেশী
প্রশস্ত হবে, অর্থাৎ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিকে
প্রমাণ করবে।
অনিশ্চয়তা নীতি আসলে কি এবং কেন ?
১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ উল্লেখ করেছিলেন,
“কোন কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একইসাথে নির্ভূলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব
নয় । এদের একটিকে যতটা নিখুঁত করা হবে, অন্যটি তত অনিশ্চিত
হবে।”
উদাহরণস্বরূপ, পদার্থের কোন একটি কণা যেকোন মূহুর্তে ঠিক কোথায় আছে, তা জানার জন্য আমাদেরকে কণাটির উপর আলো ফেলতে হবে । যার সাহায্যে আমরা এর
অবস্থান নির্ণয় করতে পারবো । ম্যাক্স
প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, ইচ্ছেমত বা ক্ষুদ্র
পরিমাণ আলো ফেললেই হবেনা । অন্তত এক কোয়ান্টাম পরিমাণ আলো ফেলতে হবে ।
কোয়ান্টাম পরিমাণ আলো ফেলে অবস্থান সঠিকভাবে মাপা গেলে, তাতে কোন সমস্যা নেই । কিন্ত সেই অবস্থাতে কণাটির উপর আলো পড়ায় কণাটি
উত্তেজিত হবে । ফলে কণাটির গতিপথ এমনভাবে পাল্টে যাবে যে, সেটা
ভালভাবে দেখাও যাবেনা । এতে করে আমরা সঠিকভাবে তার ভরবেগ নির্ণয় করতে পারবোনা ।
যদি আলো না ফেলে চেষ্টা করি, সেক্ষেত্রে এর
গতিপথ পরিবর্তন না ঘটার কারণে এর ভরবেগ সঠিকভাবে মাপা যাবে । কিন্তু সেক্ষেত্রে
কণাটি স্পষ্টভাবে দেখা যাবেনা বিধায়, এর অবস্থান নির্ণয় করা
সঠিক হবেনা ।
তাহলে এই ভুলের পরিমাণ কত ? কণার অবস্থান
এবং ভরবেগ নির্ণয়ের এই ত্রুটির সর্বনিম্ন পরিমাণ হবে, প্ল্যাঙ্কের
ধ্রুবকের মানকে ঐ কণার ভরের দিগুণ দিয়ে ভাগ করলে যে মান পাওয়া যায়, তার মানের সমান ।
ল্যাপ্লাসের লক্ষ্য ছিল, যেকোন একটি তাৎক্ষনিক
সময়ে মহাবিশ্বের কণাদের অবস্থান এবং ভরবেগ জানা । কিন্তু হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা
নীতির মাধ্যমে তার এই ইচ্ছের পতন ঘটেছিল ।
§
Comments
Post a Comment