আলোক-তড়িৎক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট

 আলোক-তড়িৎক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট

১৮৩৯ সাল। ফরাসী বিজ্ঞানী এডমন্ড বেকরেল এক আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ করলেন। তিনি সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করছিলেন। দেখেন বৈদ্যুতিক কোষের ওপর আলো একটা ভালো প্রভাব ফেলে। কিন্তু এ ঘটনার ব্যাখ্যা তাঁর কাছে ছিল না। আর এটা নিয়ে তিনি খুব বেশি মাথাও ঘামাননি। কিন্তু এটাই ছিল কোনো বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ করা প্রথম আলোক-তড়িৎক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট।

তিন দশক পর ১৮৭৩ সালে বিট্রিশ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার উইলাফবি স্মিথ টেলিফোন অপারেটে হিসেবে  ট্রান্স আটলান্টিক টেলিফোন ক্যাবলের রোধ পরীক্ষা করার দায়িত্ব পালনকালে তিনি রোধক পরিমাপের একটা যন্ত্র ব্যবহার করতেন। রোধকটা ছিলি সেলিনিয়ামের। একদিন তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, বৈদুতিক রোধকের নতুন এক ব্যাপার। আগে কেউ জানতেন না এ ব্যাপারটা। তিনি লক্ষ্য করেন, সেলিনিয়াম রোধকের ওপর সূর্যের আলো পড়লে বেড়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ প্রবাহ। অর্থাৎ কমে যাচ্ছে রোধকের মান। হয়তো মনে হতে পারে, সূর্যের তাপের কারণে এমনটা হচ্ছে। তড়িৎগতিবিদ্যা কিন্তু উল্টো কথা বলে, তাপ বাড়লে বেড়ে যায় রোধেকের রোধকত্ব। ফলে বিঘ্ন ঘটে স্বাভাবিক তড়িৎ প্রবাহে। তাহলে স্মিথের এ ঘটনার ব্যাখ্যা কী? তাপ এখানে মূল ফ্যাক্টর নয়। মূল ফ্যাক্টর আলো। কিন্তু কেন, কীভাবে এই ঘটনা ঘটছে সে ব্যাখ্যা ছিল না স্মিথের কাছে।

১৮৭৮ সাল। জার্মান বিজ্ঞানী হেনরিখ হার্জ এই ঘটনা একটু অন্যভাবে লক্ষ্য করেন। অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ অর্থাৎ বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্ল্যার্ক ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু সেই আলোর সন্ধান তিনি পাননি। পরে সেই অদৃশ্য আলোক তরঙ্গের হদিস দেন হার্জ এবং ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। হার্জই প্রথম বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করেন। এজন্য তিনি ব্যবহার করেন বায়ুশূন্য ক্যাথোড টিউব। এ ধরনের একটা টিউবেই পরে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন স্যার জে জে টমসন।

ক্যাথোড টিউবের ভেতর যে ক্যাথোড পাত থাকে সেটা ধাতুর তৈরি। পাতটা ওপর তিনি অতি বেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি (Ray) দিয়ে আঘাত করেন। এর ফলে পাত থেকে উৎপন্ন হয় আলোর ঝলক। ক্যাথোড টিউবে যে ক্যাথোড রশ্মি দেখা যায়, সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। একদল বিজ্ঞানী মনে করতেন ক্যাথোড রশ্মি হলো একধরনের কণাদের প্রবাহ। কণারা উচ্চগতিতে প্রবাহিত হয় বলে এরা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই উজ্জ্বল আলোই আমরা দেখি ক্যাথোড রশ্মি হিসেবে। অন্যদিকে হার্জসহ কিছু বিজ্ঞানী মনে করতেন, ক্যাথোড রশ্মি আসলে এক ধরনের বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ।

১৮৮৮ সালে আরেক জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেম হলকওয়াস ফটোতড়িৎক্রিয়ার পরীক্ষাটা আরেকটু গুছিয়ে করেন। তিনি দেখান এক আশ্চর্য ঘটনা। ক্যাথোডের ওপর অতি বেগুনি রশ্মি দিয়ে আঘাত করলে ক্যাথোড দ্রুত চার্জ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ ক্যাথোডের ঋণাত্মক চার্জ দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়। যতক্ষণ ক্যাথোডে চার্জ থাকে, ততক্ষণ আলোর ঝলকানি দেখা যায়। কিন্তু অ্যানোডের ওপর বেগুনি রশ্মি দিয়ে আঘাত করলে কোনো ঘটনা ঘটেনা। অর্থাৎ আন্যোডের ধনাত্মক চার্জের কোনো নড়চড় হয় না। এখানে একটা কথা বলে রাখা জরুরি। ব্যাটারি বা ড্রাইসেলের যে প্রান্ত ধনাত্মক চার্জযুক্ত, সে প্রান্তকে বলে ক্যাথোড। আর যে প্রান্ত ঋণাত্মক চার্জযুক্ত সে প্রান্তকে বলে অ্যানোড। ক্যাথোড টিউবে ব্যাপারটা ঠিক উলটো। একটা ব্যাটারিকে সঙ্গে ক্যাথোড টিউবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। যে প্রান্ত ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত, সেই প্রান্তকে ক্যাথোড বলে। অর্থাৎ যে প্রান্ত থেকে ক্যাথোড রশ্মি অর্থাৎ ঋণাত্মক চার্জের কণারা নির্গত হয়, সেটাকে বলে ক্যাথোড পাত বা ক্যাথোড দণ্ড। উলটো দিকের পাত বা দণ্ডকে বলে অ্যানোড। এটা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

যাই হোক, হলকাওয়াসের পরীক্ষাটা ছিল এমন, ধনাত্মক চার্জের কোনো ধাতব পাতের ওপর অতিবেগুনি রশ্মি ফেললে কোনো স্ফুলিঙ্গই দেখা যায় না। কিন্তু ঋণাত্মক পাতে ফেললে স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় এবং দ্রুত পাতের ঋণাত্মক চার্জ কমতে থাকে। একসময় ঋণাত্মক চার্জ শূন্য হয়ে যায়।

হলকাওয়াস পর্যবেক্ষণটাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু কেন এই ঘটনা ঘটে তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর ১৮৯৯ সালে টমসন দেখালেন, ক্যাথোড টিউবের ক্যাথোড পাত থেকে নির্গত যে আলোক রশ্মি অ্যানোডের দিকে প্রবাহিত হয়, সেই রশ্মি আসলে ইলেকট্রনের স্রোত। টমসন তখন আরেকটা ব্যাখ্যাও দিতে সক্ষম হন৷ অতিবেগুনি রশ্মির আঘাতে যে স্ফুলিঙ্গ বা আলোর ঝলক দেখা যায়, সেই স্ফুলিঙ্গও আসলে ইলেকট্রনের ঝলক।

আলোক-তড়িৎক্রিয়ার সমস্যার সমাধান লুকিয়ে ছিল প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বে।

আলোক-তড়িৎক্রিয়ার সমস্যার সমাধান লুকিয়ে ছিল প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বে। কিন্তু প্ল্যাঙ্ক ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেননি। ভেবেছিলেন সুইজ্যারল্যান্ডের বার্ন শহরে পেটেন্ট অফিসে কর্মরত জার্মান তরুন আলবার্ট আইনস্টাইন।

১৯০৫ সাল নাগাদ সকল প্রস্তুতি শেষে আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব, বা স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রকাশের অপেক্ষারত ছিলেন প্রকাশিত বিশেষ এই রিলেটিভিটি থেকেই বেরিয়ে এসেছিল পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা সমীকরণটি। ভর শক্তির সমীকরণ, E = mc2তাতে ছিল একটি বিশেষ কথা। সেই বিশেষ কথাটি নিয়ে আইনস্টাইন থিওরি অব রিলেটিভিটির ছাড়াও আরেকটা প্রবন্ধ লিখলেন। সেই প্রবন্ধে দিলেন আলোক-তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যাএজন্য তিনি সহায়তা নিলেন  প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কোয়ান্টাম তত্ত্ব সূত্রে আইনস্টাইন বললেন, আলোর পক্ষেও সম্ভব ইলেকট্রনের মতো ভরযুক্ত বস্তু কণাকেও স্থানচ্যূত করা- যদি সেটার আচরণ কণার মতো হয়।

উল্লেখ্য, আলোর কণাতত্ত্বের বিপরীতে টমাস ইয়াং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তরঙ্গ তত্ত্ব। তরঙ্গ তত্ত্ব প্রমাণিত সত্য। পক্ষান্তরে আইনস্টাইন বললেন, আলোর নতুন কণা ধর্ম আসলে নিউটনের পর্যবেক্ষণ করা কণার মতো নয়। আইনস্টাইন এই কণা ধর্ম প্রতিষ্ঠা করলেন প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে। প্ল্যাঙ্ক বলেছিলেন, আলো আসলে শক্তির গুচ্ছ গুচ্ছ প্যাকেটের সমষ্টি। আইনস্টাইন সেই প্যাকেটকে তুলনা করলেন শক্তির কণা হিসেবে। বহু পরে শক্তির এই কণার নামকরণ করা হয় ফোটন নামে।

আইনস্টাইন শক্তির এই কণাকে তুলনা করলেন কামানের গোলার সঙ্গে। কামানের গোলা ছুটে গিয়ে যেমন ধ্বংস করে দিতে পারে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সৈন্যদের। তেমনি আলোর এই কণার যদি পর্যাপ্ত শক্তি থাকে, সেটি গিয়ে আঘাত করবে ধাতব পদার্থের ইলেকট্রনকে। সেই আঘাতের ধাক্কা সামলাতে না পেরে ইলেকট্রন ছিটকে বেরিয়ে যাবে ধাতব পরমাণুর শেষ শক্তিস্তর থেকে। ছুটে বেরিয়ে যাওয়া এসব ইলেকট্রনের গতিশক্তি থেকেই আলোর ঝলকানি দেখা যায়।

আইনস্টাইনের মতে, ভর না থাকলেও আলোর কণার গতিশক্তি যাকে মোমেন্টাম বা ভরবেগ বলা হয়- এই গতিশক্তি তথা ভরবেগের কারণেই আলো এভাবে ইলেকট্রনকে ছিটকে বের করে দিতে পারে। আইনস্টাইন আরও দেখালেন, সব আলোর পক্ষে এভাবে ইলেকট্রনকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য থাকতে হবে পর্যাপ্ত শক্তি। অতি বেগুনি রশ্মির পক্ষে ব্যাপারটা সহজ, কারণ এদের কম্পাঙ্ক অনেক বেশি, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম, তাই শক্তিও অনেক বেশি। অন্যদিকে আমাদের দৃশ্যমান আলোগুলোর অত শক্তি নেই। তাই এদের দিয়ে আলোক-তড়িৎক্রিয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় ইনফ্রারেড কিংবা বেতার তরঙ্গের পক্ষেও। এদের শক্তি দৃশ্যমান আলোর চেয়েও অনেক কম। অন্যদিকে গামা রশ্মি কিংবা এক্স-রের কম্পাঙ্ক অতি বেগুনি রশ্মির চেয়েও বেশি। তাই আলোক-তড়িৎক্রিয়ায় এদের সক্রিয়তা অনেক বেশি।

আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে আলোক-তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যা যেমন দিলেন, আলোর কণার নানা চরিত্র ও ধর্মের ব্যাখ্যাও এলো এই কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে। পরে ১৯১৪ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট অ্যান্ড্রুজ মিলিক্যান পরীক্ষাগারে আইনস্টাইনের ব্যাখ্যার প্রমাণ দিলেন।

অন্যদিকে ৫ বছর পেরিয়ে এসেও প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক মহলে তেমন আলোড়ন ফেলতে পারেনি। কিন্তু আইনস্টাইন যখন এর ব্যবহার একবার দেখিয়ে দিলেন, তখন এটা নিয়ে হৈ চৈ শুরু হলো। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নীলস বোর পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যা করতে গিয়েও আশ্রয় নিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের। তখন থেকেই মূলত কোয়ান্টাম তত্ত্ব নামক পদার্থবিজ্ঞানের এই নতুন শাখাটির পরিপূর্ণতার দিকে যাত্রা শুরু হয়।

আলোক তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যার পরই মূলত তরুণ বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর।

আলোক তড়িৎক্রিয়া ব্যাখ্যার পরই মূলত তরুণ বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর। এর 15 বছর পর নোবেল পান ম্যাক্স প্লাঙ্ক এবং তার পরের বছরই আলোক তড়িৎক্রিয়া ব্যখ্যার জন্য আইনস্টাইন নোবেল পুরষ্কার পান।



Comments

Popular posts from this blog

ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথ্য ব্যাংক (বাংলাদেশ)

Science-Tech News

আধুনিক বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্বের আলোকে মহাবিশ্বের জন্মোতিহাস